মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে চাই সমন্বিত প্রয়াস

বাংলাদেশে একটা সুন্দর জাতি গঠনের পেছনে যতগুলো অন্তরায় রয়েছে, মাদকাসক্তি এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। মাদকাসক্তি ব্যক্তিকে ধ্বংস করে, পরিবারকে নিঃস্ব করে, আর জাতিকে করে পঙ্গু। এ সমস্যা থেকে আশু উত্তরণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট, গোল্ডেন ট্রায়াংগেল ও গোল্ডেন ওয়েজের মধ্যে অবস্থিত। যেজন্য মাদক চোরাচালানিরা দীর্ঘদিন এ দেশটিকে তাদের চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বিগত তিন-চার দশক যাবত্ এদেশের মানুষ বিশেষ করে যুবসমাজের একটা বিরাট অংশ মাদকসেবন করছে।

আমাদের দেশে মাদকদ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, প্যাথিডিন, হেরোইন, বাংলা মদ প্রভৃতি। তবে ইদানীং আইস ও ট্যাপেনটাডল নামক দুটি মাদক এদেশে ব্যবহূত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মাদক দুটির মানবদেহে ক্ষতির মাত্রা ইয়াবা থেকেও বেশি। দেশে মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা (জিরো টলারেন্স) চালু হওয়ার পর ইয়াবা ও ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে মাদকসেবীরা এ দুটি মাদকের দিকে ঝুঁকছে। অতি সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে আসা আইসের একটি চালান ঢাকাতে ধরা পড়েছে। অপরদিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে ভারত থেকে আসা ট্যাপেনটাডলের একটি চালান ধরা পড়েছে। ট্যাপেনটাডল বাংলাদেশেও তৈরি হয়। ট্যাপেনটাডল হলো এক প্রকার ওপিওয়েড ব্যথানাশক ট্যাবলেট, এটা সেবনের ফলে সাময়িক উচ্ছ্বাস, অলীক কল্পনা, তন্দ্রাভাব প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। ট্যাপেনটাডল দীর্ঘদিন সেবন করলে ঘুমের সমস্যা, শারীরিক দুর্বলতা, হূদ্যন্ত্রের প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, মাথাব্যথা, পাকস্থলীর ব্যথা ও জীবনের প্রতি হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। অপরদিকে আইস হলো দানাদার মেথাএমপেথামিন। এটা ব্যবহারের ফলে শরীরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যা দু-তিন দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। আইস দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়ে থাকে।

যেসব কারণে সাধারণত একজন মানুষ মাদকাসক্ত হচ্ছে সেগুলো হলো হতাশা, বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক অশান্তি, ভঙ্গুর পরিবার, নিঃসঙ্গতা, খারাপ সঙ্গ, মাদকের সহজ লভ্যতা, সিগারেট খাওয়া, মাদকের কুফল না জানা প্রভৃতি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার মতে, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি এবং মাদকাসক্ত প্রায় ৬০ লাখ। মাদকাসক্তরা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। দেশে যেসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তার ৮০ শতাংশের সঙ্গে মাদকাসক্তরা জড়িত। তারা ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, উত্ত্যক্তকরণ, খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখলসহ নানা অপরাধে জড়িত। আবার মাদকের টাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে কিশোর গ্যাং যারা নানা অপরাধমূলক কর্মকা্লে জড়িত।

এদেশে এখনো বেশিসংখ্যক মানুষ ইয়াবা ও ফেনসিডিলে আসক্ত। ইয়াবা আসে মিয়ানমার থেকে এবং ফেনসিডিল ভারত থেকে। ইয়াবার কারখানা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে। আর ফেনসিডিলের কারখানা ভারতে। আশ্চর্য বিষয়, মিয়ানমার ও ভারতের মানুষ ঐ মাদকগুলো সেবন করে না। মাদকাসক্তরা বিশেষ করে দরিদ্রশ্রেণির মাদকসেবীরা যে কত করুণ ও মানবেতর জীবন যাপন করে, তা বর্ণনাতীত। তারা অর্থ পেতে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, বাড়িতে ভাঙচুর করে, অভিভাবকদের মারধর করে, এমনকি অভিভাবকদের হত্যা পর্যন্ত করে থাকে।

বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করে জলপথে, স্থলপথে ও আকাশপথে। তবে জলপথেই বেশি মাদক আসে বলে জানা যায়। অনেকগুলো সিন্ডিকেট এ চোরাচালানের পেছনে রয়েছে। এ সিন্ডিকেটগুলো এতটা শক্তিশালী ও সংগঠিত যে, দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে তাদের বেতনভোগী লোক নিয়োগ করা রয়েছে; মাদকবিরোধী অভিযানের সংবাদ তারা সহজে পেয়ে যায় এবং দ্রুত তাদের রুট পরিবর্তন করে। কোনো কোনো মাদক চোরাচালানি গোষ্ঠীর কাছে আধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। একটি সূত্র থেকে জানা যায়, অনেক মাদক সিন্ডিকেটের আবার নিজস্ব রসায়নবিদ রয়েছে, যারা ড্রাগ পিকারসার ব্যবহার করে অতিদ্রুত মাদকের প্রকৃতি বা প্রকার পরিবর্তন করতে পারে। আরো জানা যায়, মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জনগণের দৃষ্টি ফেরানো বা সফল মাদকবিরোধী অভিযান জনমানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে লোকবিহীন পরিত্যক্ত মাদকের চালান আটকের নাটক সাজায়। এ নাটকের অন্তরালে তারা মাদকের অন্য চালান সহজে পাচার করে থাকে।

মাদক কমানোর উপায়গুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো সরবরাহ কমানো। আমাদের দেশের বর্ডারকে বলা হয় পোরাস (ছিদ্রযুক্ত) বর্ডার। যার ফলে অতি সহজেই মাদকদ্রব্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। পুলিশ, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জনগণ একত্রে অভিযান ও সহায়তা করে মাদকের সরবরাহ কমাতে পারে। মাদক কমানোর দ্বিতীয় উপায়টি হলো চাহিদা কমানো। চাহিদা কমানোর জন্য ক্রাস প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া যেতে পারে। যেমন মাদকাসক্তদের চিকিত্সার জন্য জেলা শহর ও নগরগুলোতে বিদ্যমান হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পাশাপাশি অস্থায়ী ভিত্তিতে হাসপাতাল ও ক্লিনিক তৈরি করে কয়েক মাসব্যাপী চিকিত্সা দেওয়া যেতে পারে। চিকিত্সা শেষে যদি কাউকে কাজ দেওয়া যায়, তাকে কাজ দিয়ে পুনর্বাসন করা যেতে পারে। এছাড়া পরিবার ও সমাজ চিকিত্সা শেষে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে, সময় দিয়ে, তাকে সুস্থ জীবনযাপনে ফেরাতে পারে।

সর্বোপরি মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রয়োজন। মাদকবিরোধী র্যালি, সমাবেশ, বিট পুলিশিং কার্যক্রম ও লিফলেটের মাধ্যমে মানুষকে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ক্রীড়াচর্চা, বস্তুনিষ্ঠ সিনেমা, নাটক, কবিতা, উপন্যাস, গানসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মাদকের কুফল সম্পর্কে অবহিত করে মানুষকে সচেতন করে এক আদর্শ সমাজ গঠন করতে হবে।

n  লেখক :পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ

একাডেমি, সারদা, রাজশাহী।