সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১১:২৭

রাজধানীর ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাসের মালিকানা, আয়-ব্যয়, পরিবহন সেবা এবং পরিচালনা পর্ষদ ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের যানবাহন ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গত ২৭ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। একই সাথে প্রকাশিত সংবাদের সপক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের প্রতিবাদ
সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির পক্ষে জনসংযোগ কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ হক স্বাক্ষরিত এক প্রতিবাদলিপিতে প্রকাশিত সংবাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রতিবাদলিপিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ব্যক্তিগত বা একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত চলে না। বাসটি কেনার প্রাথমিক পর্যায়ে বিআরটিএ-র আইনি, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে তৎকালীন প্রতিষ্ঠান প্রধানের টিআইএন নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি ছিল তৎকালীন সময়ের একটি সম্পূর্ণ আইনি ও বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মাত্র। এর সাথে ব্যক্তিগত কোনো মালিকানা দাবির সুযোগ নেই এবং কখনোই তা করা হয়নি। বিআরটিএ-তে বর্তমানে বাসটির নাম হস্তান্তরের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলমান রয়েছে। উক্ত বাসটি ক্রয়ের জন্য যাবতীয় অর্থ সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে।

বাসের আয় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার অভিযোগকে সম্পূর্ণ মনগড়া আখ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠান জানায়, বাসের সমুদয় আয় ও পরিচালনা ব্যয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। প্রতি মাসে অর্থ-উপকমিটি দ্বারা উক্ত হিসাব নিখুঁতভাবে অডিট ও পর্যালোচনা করা হয় এবং গভর্নিং বডির নিয়মিত সভায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উত্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠানের এই সুনির্দিষ্ট ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামোর মধ্যে কোনো প্রকার আর্থিক অনিয়ম বা ‘এদিক-সেদিক’ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দাবি করে, বাসের আয়-ব্যয় নিয়ে যে বিপুল লাভের হিসাব দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত এই পরিবহন সেবাটি কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা ভাড়ায় পরিচালিত হয় না। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া সামান্য ভাড়ায় বিপুলসংখ্যক বাসের জ্বালানি, ড্রাইভার-হেলপারের বেতন, বার্ষিক রুট পারমিট, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস সনদ এবং নিয়মিত মেইনটেন্যান্স খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মানসম্মত যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব বাজেট থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থনৈতিক ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। শিক্ষার্থীরা ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ের যেকোনো প্রতিযোগিতা, একাডেমিক সফর এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জরুরি প্রয়োজনে এই পরিবহন ব্যবহৃত হয়।

বাস বাণিজ্যিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত ভাড়ায় খাটানোর অভিযোগকে ১০০% অসত্য দাবি করে সংবাদে উত্থাপিত দাবির সপক্ষে অন্তত ন্যূনতম কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ থাকলে তা জনসম্মুখে উপস্থাপন করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো হয়।

প্রতিবেদকের বক্তব্য 
প্রকাশিত সংবাদটি সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান ও তথ্যাদি বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই প্রকাশ করা হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ ও জনস্বার্থমুখী সংবাদ পরিবেশনে আমরা দায়বদ্ধ।  প্রতিবাদলিপির প্রেক্ষিতে ইত্তেফাকের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো।

আয়কর বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়ি ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত থাকলে তা আইনিভাবে প্রতিষ্ঠানের দাবি করার সুযোগ নেই; এর আয়-ব্যয় ও আয়কর রিটার্নের দায়িত্ব ব্যক্তির। তর্কের খাতিরে প্রথম বাসের ক্ষেত্রে ই-টিন জটিলতার দাবি মেনে নিলেও, পরবর্তীতে অন্য বাসগুলো সরাসরি স্কুলের নামে কেনা সম্ভব হলো কীভাবে? বছরের পর বছর পার হলেও নাম পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানের নামে হস্তান্তর না করা স্পষ্টত দুর্নীতির উদ্দেশ্যে নিজের নামে রেখে দেওয়ার প্রমাণ।

যার একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হতে পারে খোদ অধ্যক্ষের ব্যবহারিত গাড়িটি। বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন সনদ অনুযায়ী ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৭-১৪৮৮ নম্বর গাড়িটি ২৭০০ সিসির টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো (হার্ড জিপ), যা প্রাইভেট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিবন্ধিত। তবে বাংলাদেশের কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের দাপ্তরিক কাজের দোহাই দিয়ে স্কুলের তহবিলের টাকায় এমন কোটি টাকার গাড়ি ব্যবহারের কোনো নজির নেই। প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এমন বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডের স্পষ্ট অপব্যবহার।
 
এছাড়া শিক্ষার্থী পরিবহনে ক্ষেত্রে কিভাবে দুনীতি হয় তার একটা হিসেবে তুলে ধরছি। প্রতিটি ৮০ আসনের বাসে প্রতি ট্রিপে ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী পরিবহন করা হয় এবং গড়ে ১২০০ থেকে ৪০০০ টাকা (গড়ে ২৫০০ টাকা) আদায় করা হয়। দুই ট্রিপে (১ম ও ২য় বর্ষ) বাসপ্রতি ফিক্সড আয় মাসে ৫,০০,০০০ টাকা। বিপরীতে, দিনে ১২০ কিমি যাতায়াতে দৈনিক খরচ  ৪৩ টাকা প্রতি লিটার এলপিজি হিসেবে ৫১৬০ টাকা। যদি প্রতি লিটারে এক কিলোমিটার ও ধরা হয় ( যদিও লিটারে ৩/৪ কিলোমিটার যায়) তবে   গ্যাস খরচ মাসে (১৩৪,১৬০ টাকা), চালক-হেলপারের বেতন (৫০,০০০ টাকা) ও  নিয়মিত সার্ভিসিং খরচ গাড়ি প্রতি (৫০,০০০ টাকা) ধরলেও সর্বসাকুল্যে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ২৩৪,১৬০ টাকা। 

সব খরচ বাদ দিয়েও প্রতি বাসে মাসে ২,৯৫,৮৪০ টাকা নিট লাভ থাকে। যেখানে প্রতিটি বাস থেকে বিপুল উদ্বৃত্ত আসে, সেখানে প্রতিষ্ঠানের ‘ভর্তুকি’ দেওয়ার দাবিটি অবাস্তব ও অর্থ আত্মসাতের চিত্র উন্মোচন করে।

প্রতিষ্ঠানের ভর্তি বা বেতন ছাড়া বাসের ভাড়ার ক্ষেত্রে কোনো অফিসিয়াল মানি রিসিট দেওয়া হয় না, যাতে অনিয়ম ঢাকা সহজ হয়। সামাজিক অনুষ্ঠানে বাস ভাড়া না দেওয়ার দাবি সত্য নয়। এমন কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া গেছে যাদের বিবাহ অনুষ্ঠানে নগদ ভাড়ার বিনিময়ে এই প্রতিষ্ঠানের বাস ব্যবহার করা হয়েছিল, এবং তা নিয়মিতভাবেই ভাড়া দেওয়া হয়।

ইত্তেফাক/এএইচপি