দেশে এখন দুই মেলা

কয়েক দিন আগে ঢাকায় হয়ে গেল আন্তর্জাতিক সাহিত্য মেলা (লিট ফেস্ট)। এই মুহূর্তে চলছে কর মেলা ঢাকাসহ সারা দেশের শহরগুলোতে। বিগত কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় কর মেলা এখন বস্তুত উত্সবে পরিণত হয়েছে। রাজধানী শহর, বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে এখন নিয়মিত কর মেলা বসে। হাজার হাজার করদাতা, সম্ভাব্য করদাতা, উত্সুক করদাতা এই মেলায় যান। দেখেন বুঝতে চেষ্টা করেন, বিপুলসংখ্যক লোক কর রিটার্ন জমা দেন, ব্যাংকের সেবা নেন। রাজস্ব বোর্ডের সেবা নেন। এ এক উত্সাহব্যঞ্জক ঘটনা। সারা দেশে উত্সবমুখর পরিবেশে তা ঘটে চলেছে। এবার অবশ্য আরো একটি উত্সব এই মুহূর্তে পাশাপাশি চলছে। নির্বাচনী উত্সব। কিছুদিন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এখন তা কেটে গেছে বলে মনে হয়। সরকারি এবং বিরোধী দলগুলো ‘নমিনেশন’ পেপারস বিক্রি করছে। হাজার হাজার কর্মী নেতা বড় বড় দলের অফিসে ভিড় করছেন।

বস্তুত দেশে এখন দুই মেলা— নির্বাচনের মেলা এবং  কর মেলা। কর মেলা শুরু হওয়ার আগের দিন নির্বাচিত করদাতাদের সম্মান জানানো হয়েছে। নানা ক্যাটেগরিতে করদাতাদের সম্মান জানানো হয়েছে। এটা হচ্ছে কয়েক বছর যাবত্ই। এই সম্মাননার কারণেও কর মেলার গুরুত্ব কিছুটা বেড়েছে। এতে রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে করদাতাদের একটা সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। বলা যায়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। অফিসে গিয়ে ‘ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন’ জমা দেওয়া আর মেলায় জমা দেওয়ার মধ্যে একটা তফাত্ আছে। মেলায় করদাতারা রাজা আর অফিসে করদাতারা প্রজা। এমনই একটা অনুভূতি অনেকের। অনুভূতি যাই হোক কর মেলার ভালো প্রভাব পড়েছে করের বাজারে। মানুষ কর দিতে উত্সাহী হচ্ছে। করের ভয় কাটছে। করের দ্বারা সরকার এবং করদাতার মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠছে। এতসব ইতিবাচক ঘটনার মধ্যে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তা আবার আশাপ্রদ নয়। কয়েকদিন আগে খবরের কাগজে একটি সুন্দর বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে ‘ইনকাম ট্যাক্স’ রিটার্নের মাধ্যমে রাজস্ব বোর্ড কর পায় মাত্র মোট করের ৭ ভাগ। ৬৭ শতাংশ কর আসে উেস আয়কর থেকে। অর্থাত্ আয়ের উত্সমুখেই কর কেটে রাখার যে ব্যবস্থা আছে, তার মাধ্যমেই আয়করের ৬৭ শতাংশ আসে। মাত্র সাত শতাংশ কর জমা হয় রিটার্ন দাখিলের সময়। এর কারণ কী? কারণ করদাতাদের কাছ থেকে রিটার্ন দেওয়ার আগেই সারা বছরব্যাপী কর কাটা হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদ পাবে একজন করদাতা। সেই সময়ই আয়কর উেস কেটে নিচ্ছে ব্যাংক। স্থায়ী আমানত, মেয়াদি আমানত, সঞ্চয়ী আমানতের সুদের ওপর ব্যাংক আগেভাগেই আয়কর কেটে নিচ্ছে। কোথাও ১০ শতাংশ হারে কখনও ১৫ শতাংশ হারে। এইভাবে সকল উেস রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে ব্যাংক এবং নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান আয়কর কেটে নেয় সারা বছরব্যাপী। কোম্পানিগুলো যে আয়কর বা কর্পোরেট ট্যাক্স দেয় তা রাজস্ব বোর্ড মাসে মাসে আদায় করে নেয়।

একটি তথ্যে দেখা যায়, এই মুহূর্তে প্রায় ৬০টি উেস আয়কর কেটে রাখা হয়। এতে রাজস্ব বোর্ডের কাজ কমে। রাজস্ব বোর্ড অন্যের মাধ্যমে করের টাকা পেয়ে যায়। তার লোকবল কম লাগে। এ ছাড়া উেস কর কাটা একটা নিরাপদ ও নিশ্চিত কর আদায়ের মাধ্যম। ঘরে ঘরে গিয়ে টাকা তোলার চেয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে অগ্রিম আয়কর পাওয়া বেশ ভালো একটা পদক্ষেপ। দেখা যাচ্ছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আয়কর থেকে পাওয়া যায় মোট প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে উেস কাটা আয়কর হচ্ছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। আবার আরেকটি হিসাবে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৬ লাখের ওপর করদাতা কর দেন মাত্র ৪ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে রিটার্নের সাথে প্রাপ্ত আয়করের পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। কারণ একটাই। আগেই কর কেটে নেওয়া হচ্ছে। আবার আছে অগ্রিম আয়কর। যেমন প্রাইভেট কার ইত্যাদির ফিটনেস করতে গেলে অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। এভাবেও টাকা আদায় হয়। ফলে রিটার্নের সময় করদাতাদের আর বেশি আয়কর দিতে হয় না। বরং বিরাটসংখ্যক ক্ষেত্রে আয়কর দাতারা বেশি কর দিয়ে ফেলেন। তাদেরকে রাজস্ব বোর্ডের কাছ থেকে টাকা ‘রিফান্ড’ চাইতে হয়। এটা বড় বিড়ম্বনার কাজ। এটা ঘটছে একটা কারণে। বোর্ড বিভিন্ন উেস যে হারে কর কেটে নিচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। শতকরা হারটা কিছুটা কমালে এই সমস্যা হত না। যেমন— সুদ আয়ের সময় ব্যাংক ১০ শতাংশ উেস কর কাটে। এটা খুব সহজেই ৫ বা ৭ শতাংশ করা যায়। তাহলে ‘রিফান্ড’ চাইতে হত না করদাতাদের। এখানে আরেকটা প্রশ্নও আছে। দেখা যাচ্ছে করদাতারা প্রায় সব কর দিয়েই ফেলছেন। মাত্র ৭ শতাংশ কর রিটার্নের সাথে পাওয়ার অর্থ হচ্ছে, বাকি টাকা উেস দেওয়া হয়ে গেছে আগেই। এমতাবস্থায়, রিটার্নের হুজ্জতি থেকে করদাতাদের কি মাফ দেওয়া যায় না! শত হোক আয়কর তো সকল ক্ষেত্রেই কেটে নেওয়া হচ্ছে এবং তা আয়ের উেস। যাদের সুদ আয় আছে বা অন্যান্য আয় আছে তাদের কাছ থেকে তো আয়কর আগেই কেটে নেওয়া হচ্ছে। এবং এটা উত্তম একটা ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজস্ব বোর্ডের খরচ কমেছে, আদায়ের নিশ্চয়তা ঘটেছে। এমতাবস্থায় ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষেত্রে রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলে কি দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে? বরং উল্টো ঘটবে। লাখ লাখ মানুষ দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবে। ভয়-ভীতি থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। মানুষ নির্মল বায়ু সেবন করতে পারবে। এ কথা জানা, ‘ইনকাম ট্যাক্স’ নিয়ে যত কথাই আমরা বলি না কেন, এটা একটা বিড়ম্বনা, ভয়-ভীতির বিষয় প্রায় সকলের ক্ষেত্রে— যদিও একে ভীতিহীন করার প্রচেষ্টা আছে।

সবচেয়ে বড় কথা আয়কর রিটার্ন কতজন দেন? ইদানীংকালে বলা হচ্ছে, আয়করদাতার সংখ্যা বেশ বেড়েছে। হয়ত তা সত্যি। কিন্তু জরিপে পাওয়া যাচ্ছে ভিন্ন তথ্য। কয়েকদিন আগে একটি গবেষণা সংস্থার জরিপের একটা ফল আমরা কাগজে পেয়েছি। সেখানে বলা হচ্ছে, কর দিতে পারেন এমন লোকের মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশ রিটার্ন জমা দেন। বাকি ৬৮ শতাংশ কর দেন না। আমরা ধরেই নিতে পারি করদাতা এই ৩২ শতাংশ মানুষের মধ্যে আছে কিছু চাকরিজীবী এবং কিছু পেশাজীবী শ্রেণির লোক। চাকরিজীবীদের মধ্যে এখন আছে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় শ্রেণির লোক। এই শ্রেণির লোকের পক্ষে তাদের আয় লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাদেরকে ‘ট্যাক্স নেটের’ মধ্যে ফেলা খুব সহজ কাজ। প্রশ্ন যে ৬৮ শতাংশ করযোগ্য লোক কর দেয় না তারা কারা? দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ লোকই সরাসরি কর দেয় না। আবার ধনীদের মধ্যেও নাকি এক-তৃতীয়াংশই কর দেন না। তার মানে কী? তার অর্থ খুব সহজ। করের আইন আছে। তার বাস্তবায়ন নেই। ‘কমপ্লায়েন্স’ নেই। আমরা স্বাধীনতার ৪৬-৪৮ বছর পরেও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ করযোগ্য লোককে করের আওতায় আনতে পারিনি। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। চারদিকে টাকা, চারদিকে আয়, চারদিকে টাকার উত্সব। কিন্তু করদাতা বাড়ছে না। কর আয় বাড়ছে না। এতে দেশে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। যারা কর দিচ্ছে তারা বৈষম্যের শিকার। যারা কর দিচ্ছে না তারা আনন্দে আছে। বাড়ি-ঘর করছে। আরাম-আয়েশে জীবন-যাপন করছে। বুক ফুলিয়ে চলছে। অন্যদিকে যারা কর দিচ্ছে তাদের সঞ্চয় কমছে, খরচ করার ক্ষমতা কমছে। আবার করদাতারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছুই পায় না। বেকার হলে, চাকরি গেলে করদাতারা কি রাষ্ট্রের কোনো সহায়তা পায়? বৃদ্ধ বয়সে তারা কি কোনো ভাতা পায়? চিকিত্সার খরচ কি তারা পায়? না, এসব তারা পায় না। অথচ তারা বছরের পর বছর ধরে কর দিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু করের জালের মধ্যে আছে তাই তার ওপরই যত ‘কারিগরি’। করদাতা হতে তাই সবাই ভয় যেমন পায়, তেমনি উত্সাহিত হয় না স্বাভাবিকভাবে। এটা উদ্ভট অবস্থা। সরকারের উচিত করদাতাদেরকে অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো দেখভাল করা।

n  লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়