বাংলা নির্বাক ও সবাক সিনেমার শতবর্ষ পূর্ণ হলো এ বছর। গত সপ্তাহে (শনিবার) কোলকাতায় শুরু হয়েছে সিনেমার ২৬তম মেলা বা চলচ্চিত্র উত্সব। এই উপলক্ষে কোলকাতা এসেছিলেন বোম্বাই এর বলিউডের অমিতাভ বচ্চন, তার স্ত্রী জয়া বচ্চন, শাহরুখখান, ওয়াহিদা রহমান প্রভৃতি। এছাড়া ঐ অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন যারা, তারা আজও কিংবদন্তি। কোলকাতার এই চলচ্চিত্র উত্সবে উপস্থিত ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। কে এই সাবিত্রী? যে দেশ ভাগের পর ঢাকার এই দশ বছরের ছোট্ট মেয়েটি কোলকাতায় এসেছিলেন। তিনি এসেছিলেন তারই প্রতিবেশী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক ছাত্রের হাত ধরে। তিনি হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি তার সরস এবং কৌতুক অভিনয় দিয়ে বাংলা সিনেমাকে প্রাণ দিয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে শনিবার ইনডোর স্টেডিয়ামটি ছিল যেন চাঁদের হাট। বাংলার জামাই অমিতাভ বচ্চন বাংলা ভাষায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ এই সংলাপ দিয়ে অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করলেন। তারপর তিনি পুরো ভাষণটাই হিন্দিতে দেন। অমিতাভ তার বক্তৃতায় সকলকে হাসিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করেন, সুন্দরী মেয়েরা কারা? এক সময় সুন্দরী ওয়াহিদা রহমান আর এখন সুন্দরী তার মেয়ের ঘরের নাতনি ‘নাভেলি বা নভ্যা’। ওয়াহিদা রহমান কোলকাতায় শ্যুটিং করার সময় তার স্মৃতি উসকে দিয়ে কোলকাতা চলচ্চিত্র উত্সবে বার বার সত্যজিত্ রায়ের নাম উল্লেখ করে বলেন, তার জায়গা কেউ পূরণ করতে পারবে না।
জ্যোতিবসুর শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারই প্রথম চলচ্চিত্র উত্সব চালু করেছিলেন। আর বুদ্ধদেব বাবু সেটাকে সর্বভারতীয় স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। গত আড়াই দশক ধরে চলা চলচ্চিত্র উত্সব মঞ্চে এই প্রথম অভিযান ছবির নরসিংহ আর গুলাবি কোলকাতার চলচ্চিত্র উত্সবে এলেন। গুলাবির কি বয়স বাড়ে? গুলাবির ভূমিকায় অভিনয় করা নায়িকা ওয়াহিদা রহমান জানালেন, তিনি সত্যজিত্ রায়কে বলেছিলেন যে তিনি বাংলা জানেন না। এর উত্তরে সত্যজিত্ বলেছিলেন চরিত্রের মুখে হিন্দি ও নানা ভাষা আছে। ঐ সিনেমা করার সময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠে ওয়াহিদা রহমানের। মঞ্চে তখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বসেছিলেন। সৌমিত্রও তখন ফেলে আসা স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন। তিনি আরও বলেন যে, চলচ্চিত্র উত্সবগুলোতে সারা পৃথিবী থেকে অনেক ভালো ভালো ছবি আসে। ১৯৫২ সালে সত্যজিত্ এর তত্পরতায় যে উত্সব হয়েছিল তাতে ডি সিকা থেকে রসেলিনি সকলের ছবি দেখার সৌভাগ্য কোলকাতায় হয়েছিল। ফিল্ম স্টাডিজের অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের মতে এটিই ছিল সঠিক সিনেমা উত্সব। তবে উল্লেখ্য যে, উত্সবের সিনেমাগুলো দেখার জন্য দর্শক আসলে তেমন কেউ ছিলেন না। তারকাদের দেখে আর তাদের কথা শুনেই সবাই সোল্লাসে বেরিয়ে যায়। উদ্বোধনী ছবি ‘এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ দেখার জন্য কেউ তেমন না থাকলেও মঞ্চে ছিলেন ইরানের সাজিদ মজিদি। তিনি উত্সবের সাফল্য কামনা করেন। নন্দিতা দাশও প্রায় নিরুত্তর ছিলেন।
বহুকালপর ওয়াহিদা রহমান এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন যে—বাঙালি পরিচালকরা আমাকে একটু বেশিই পছন্দ করতেন। একটি বাংলা পত্রিকায় সাক্ষাত্কারে বলেছেন, তার প্রথম ছবি ছিল ‘তেলেগুতে’, ছবির নাম ‘রোজুলো মানকিন’। তিনি আরও বলেছেন, ‘প্যায়াসা’ ছবির শ্যুটিংয়ের সময় ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম কোলকাতা আসেন। তিনি গ্র্যান্ড হোটেলে উঠেছিলেন, ‘খামোশি’ ও ‘অভিযান’ ছবির শ্যুটিং এর সময়ও তাই। ‘প্যায়াসা’ ছবির গানের শ্যুটিং হয়েছিল গঙ্গার ধারে। গীতাদত্তের সঙ্গে তার লিপের সংযোগ ছিল অভূতপূর্ব। ‘প্যায়াসা’র সব গানই হিট হয়েছিল। এছাড়াও ‘সোলবাসাল’ ‘কাগজ কে ফুল’, ‘কালাবাজার’ ‘গাইড’, ‘প্রেম পূজারি’ ইত্যাদি ছবির এস ডি বর্মনের অনেক ভালো গানের সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেছি। তিনি আরও বলেন, শুধু বর্মনদাই নন, মানিকদা, হেমন্তদা, অমিত সেন, বাসু ভট্টাচার্য— এদের সঙ্গে তার একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কাজের সূত্রে গুরুদত্ত ও দেব আনন্দের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হত। এদের ছবিতে মিউজিক করতেন আর ডি বর্মন। আর মাঝে মাঝেই পান খেতেন। এসব কথা বলার পর ওয়াহিদা রহমান আরও বললেন, তিনিও বর্মনদার কাছে পান খেতে চেয়ে বলতেন, দাদা এক পান দোগে? তিনি বলতেন— ‘হাঁ হাঁ ইধার আও’! বর্মনদা তাকে বাচ্চার মতো দেখতেন কিন্তু অন্যরা পান চাইলে যেমন গুরুদত্তজি বা দেব আনন্দ পান খেতে চাইলে তিনি বলতেন— ‘যাও যাও নিজেরা কিনে আনো।’
‘কালাবাজার’ ছবির সেটে একদিন বসে বর্মনদা বললেন, ‘ওয়াহিদা একটা গান রেকর্ড করে এনেছি। এই রকম করে করবে—’ এ কথা বলে নিজেই ধুতির কোনাটা ধরে স্টেপিং করে গাইতে লাগলেন। ‘রিমঝিমকে রাতে লেনে আয়ী বরসাত’। এটা দেখে ওয়াহিদা রহমানসহ সকলেই প্রায় হেসে ফেলেছিলেন। আর একদিনের কথা প্রসঙ্গে ওয়াহিদা রহমান বলেন যে, একদিন নন্দা, শাকিলা ও তিনি বিরগালে সিনেমা দেখতে গিয়েছেন এমন সময় হঠাত্ সেখানে বর্মনদা সস্ত্রীক উপস্থিত হয়ে তাদের ‘আইসক্রিম’ খাবার জন্য বলেন। যদিও বর্মনদার স্ত্রী মীরাদির জন্য শেষ পর্যন্ত আইসক্রিম খাওয়া হয়নি। কারণ তিনি ওয়াহিদা রহমান, শাকিলা ও নন্দার ডায়েট সম্পর্কে চিন্তিত ছিলেন, তাই আইসক্রিম খাওয়ার ব্যাপারে তার আপত্তি ছিল।
এই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট পরিচালক মহেশ ভাট বলেন— বাংলা সিনেমা ‘স্টোরিটেলিং’ এ সবার সেরা। বাঙালিদের জন্যই মুম্বাইর সিনেমার গৌরব বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন, তাঁর মতে আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া হলো সব সময় সংঘবদ্ধ হয়ে থাকা, কোনো রং না দেখে ভারতে বৈচিত্র্যের মধ্যেই তার অখণ্ডতা রক্ষা করা উচিত। তিনি সকলকে আহ্বান করে বলেন- ‘আসুন সকলে এক হয়ে থাকি, যাতে কেউ এই দেশটাকে ভাগ করতে না পারে, উত্সব সব সময় ভবিষ্যতের একটা পথ দেখায়। এই চলচ্চিত্র উত্সবও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে বড় একটা জানালা উন্মুক্ত করে দেয়।
বাংলা চলচ্চিত্র ১০০ বছর অতিক্রান্ত হলো। এই চলচ্চিত্রতে যারা অভিনয় করে বাংলা সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন- যেমন উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেন জুটি। তারা কিন্তু এই উত্সবে ব্রাত্য থেকে গেলেন। কি উদ্যোক্তা কি বক্তা কেউ এই দুজনের নাম নেননি। অনুষ্ঠান মঞ্চে দেখা গেল না সুচিত্রা কন্যা মুনমুন সেন বা তার নাতনিদ্বয়কে যারা বর্তমান বাংলা সিনেমার সঙ্গে জড়িত। অর্থাত্ রাইমা ও রিয়া। এই উত্সবটাকে রবীন্দ্রনাথের কথায় বলা যায়- ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’।
n লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক