বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান খাত হচ্ছে রেমিটেন্স। প্রায় ১ কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, লিবিয়া ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছেন। তাঁদের প্রেরিত অর্থ আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে অনেকাংশে অবদান রাখছে। এটি অর্থনীতির একটি বিশাল খাত হওয়া সত্ত্বেও বিদেশে শ্রমিক পাঠাতে অনিয়ম একটি সাধারণ ঘটনা, এমনকি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। ২০১২ সালে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আমাদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার ফলে কম খরচে G to G-এর মাধ্যমে শ্রমিকরা মালয়েশিয়া যেতে পারেন। বাংলাদেশের ১০ এজেন্সিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ড. মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে এই চুক্তি বাতিল করেন। অভিযোগের অন্যতম কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, ব্যাপক অনিয়ম করে বেশি টাকা আদায় করছে এজেন্সিগুলো।
কোটি কোটি ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন শ্রমিকরা। আমাদের প্রবাসীরা বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকেন। তাঁরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, দেশ থেকে কর্মসংস্থানের জন্য বাইরে যাওয়ার সময় ভিটেমাটি সব বিক্রি করতে হচ্ছে। দালালদের দৌরাত্ম্যের ফলে যে টাকা লাগার কথা তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা লাগছে। অসহায় মানুষগুলো বাধ্য হয়ে এ টাকা জোগাড় করার জন্য তাদের সকল সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে। তা সত্ত্বেও তারা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাদের ভালো কাজের বা ভালো পারিশ্রমিকের লোভ দেখালেও বাস্তবে নিতান্তই কম পারিশ্রমিক। অনেককে অবৈধ উপায়ে পাঠানো হচ্ছে। যার ফলে তাদের ফেরত পাঠানো হয় বা সেদেশের বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। এদিকে পরিবার বসে থাকে এক বুক আশা নিয়ে, কিন্তু তাদের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয় না। এভাবে অনেক পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পথে পড়ে। অথচ এই শ্রমিকদের অর্থই আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। তাঁরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা বিভিন্ন কাজে তাঁরা দূতাবাসগুলোতে গেলে সেখানেও বিভিন্ন সেবা পেতে দালালের খপ্পরে পড়তে হয়।
প্রবাসীরা যেখানে আমাদের জন্য আশীর্বাদ সেখানে প্রত্যেকটা জায়গায় কেন তারা হয়রানির শিকার হবে? তাদের সর্বোচ্চ সেবার নিশ্চয়তা দিয়ে বিদেশে পাঠানোর সময় দালালের দৌরাত্ম্য হ্রাসের ব্যবস্থা করতে হবে। টাকা জোগাড় করতে যেন তাদের ভিটেমাটি বিক্রি করতে না হয়। ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর ১০০ কোটি টাকা তহবিল নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের সহজ শর্তে বিনা জামানতে স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়া। ব্যংকের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে হবে যেন সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ সুবিধা পেতে পারে। প্রবাসে তাদের কাজের সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, অযথা হয়রানি বন্ধ করতে হবে। বিশেষত নারীরা যেন কোনো অবস্থাতেই হয়রানির শিকার না হন। যে এজেন্সিগুলো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের লাইসেন্স বাতিল করলেই হবে না, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দূতাবাসে যেসব সেবার জন্য প্রবাসীরা যান সেগুলো সহজলভ্য করতে হবে। সেখানে যেন দালালের দৌরাত্ম্য না থাকে। সর্বোপরি বিশাল সংখ্যক প্রবাসীকে তাদের সকল সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়