সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে সর্বশেষ ইলেকটোরাল কলেজের আনুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নানা অভিযোগ, ষড়যন্ত্র ও রিপাবলিকানদের নানা কার্যকলাপের ফলে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে এ ফল এখনো মানতে পারছেন না ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা। এবং কয়েক ডজন আইনি লড়াইয়ে পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছেন। তবু দমে নেই ট্রাম্প। বিশেষ কিছু অঙ্গরাজ্যে মার্শাল ল করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠান কিংবা কারচুপির অনুসন্ধানে বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগের কথাও আসছে। ট্রাম্প শিবির বাইডেনকে ‘ওয়াকিং ডেড’ বা হাঁটাচলা করা লাশ বলে পরিহাস করলেও শেষ হাসি বাইডেনই হেসেছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অতীতের সব ট্রাক রেকর্ড ভেঙে তিনি সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী মার্কিন নীতির প্রভাব সর্বজনবিদিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি শুধু একটি দেশ বা অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতিই নয়, বরং বিশ্বরাজনীতির গতি-প্রকৃতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারাকে প্রভাবিত করে। দেশটির ক্ষমতার পালাবদলে পররাষ্ট্রনীতিতে কী পরিবর্তন আসবে এবং বাইডেনের নেতৃত্বে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে—এটা এক বড় প্রশ্ন। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি পররাষ্ট্র বিভাগ, পেন্টাগন, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কাউন্সিল সর্বোপরি কংগ্রেসের ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল। এটি এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়। প্রণিধানযোগ্য, নির্বাচনের আগে বাইডেনের বক্তব্যে বৈদেশিক সম্পর্ক সংক্রান্ত যেসব বিষয় স্থান পেয়েছে তিনি সেসব বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। নতুন মার্কিন নেতৃত্বে বিশ্বে বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া নীতি কী হবে তা এখন আলোচ্য বিষয়।
ট্রাম্পের স্বৈরতান্ত্রিক ও একগুঁয়ে শাসনের ফলে আমেরিকা ঘরে ও বাহিরে দুর্বল হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই বাইডেনকে সে জের টানতে হবে। বাইডেন প্রথমত সেটি পুনরুদ্ধারে নিবেদিত হবেন। গত মার্চে ফরেন পলিসি সাময়িকীতে ‘Why America Must Load Again’ শিরোনামে লেখা এক নিবন্ধে বাইডেন তেমন একটি নীতিরই আভাস দিয়েছিলেন।
অভ্যন্তরীণ নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এটা বেশ অনুমিত। মধ্যবিত্তদের অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রতি নজর মার্কিন মূল্যবোধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা, স্বাস্থ্যসেবায় ওবামাকেয়ারের ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনসহ মার্কিন প্রগতিশীলদের সমর্থন এবং সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণের বিরোধিতা, শেতাঙ্গদের উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাবের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও জাতিগত বিভাজনের প্রতি অসমর্থন এটির আভাস দেয় যে বাইডেন ট্রাম্প প্রশাসনের অযৌক্তিক সিদ্ধান্তগুলো দূরে ঠেলে গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হবেন।
বাইডেন বিশ্বাস করেন যে, বহির্বিশ্বে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী হতে হবে। এই লক্ষ্যে তিনি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোনিবেশের পাশাপাশি বহির্বিশ্বে নজর দিবেন। বাইডেনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে ট্রাম্পের আমেরিকা প্রথম নীতির দরুন ইউরোপের সঙ্গে ক্ষয়িষ্ণু সম্পর্কে জীবন ফিরিয়ে আনা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্ররাও সম্পর্কের পালে হাওয়া দিতে উন্মুখ হয়ে আছে। উদাহরণস্বরূপ জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাশ চিফ বলেন, আমরা একটি নতুন ট্রান্স এ্যাটল্যাস্টিক সম্পর্ক শুরু করেছি এবং একটি নতুন চুক্তির জন্য আমাদের সহযোগিতায় বিনিয়োগ করতে চাই। অধিকন্তু বাইডেনের বিদেশ নীতির অন্যতম প্রাধান্য হবে ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার যা ট্রাম্পের আমলে তলানিতে ঠেকেছিল। একটি বিবৃতিতে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জেনস স্টলটেনবার্গ বাইডেনের নির্বাচনকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন আমরা যে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি সেগুলো মোকাবিলায় আমাদের সম্মিলিত শক্তির প্রয়োজন ।
বাইডেনের প্রেসিডেন্সি আন্তর্জাতিক চুক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং বহুপাক্ষিকতাবাদকে প্রসারিত করতে প্রয়াস পাবে। ট্রাম্প যে পদক্ষেপ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ত্যাগ করেছিলেন সেগুলোতে তিনি আবারও যোগ দিতে আগ্রহী। তার প্রথম কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হবে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে আসা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হয়ে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী আরো শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া তৈরি করা। বাইডেন তিন ইউরোপীয় শক্তি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি এবং পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনকে নিয়ে ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে কাজ করতে চান যেটি ট্রাম্প ২০১৮ সালে ত্যাগ করেছিলেন। ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বলেন, বাইডেনের নির্বাচন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতীতের ভুলগুলো শুধরানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতার পথে ফিরে আসার একটি সুযোগ তৈরি করবে। যেহেতু বৈশ্বিক রাজনীতির দাবার কোর্ট ক্রমেই ইউরোপ থেকে এশিয়াতে স্থানান্তরিত হচ্ছে, সেহেতু বাইডেনের নীতি স্বভাবতই এশিয়াকে প্রাধান্য দেবে। এশিয়ার বিকাশমান অর্থনীতি, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভূকৌশলগত গতিশীলতা বাইডেনের এশিয়া নীতিকে নিশ্চিতভাবে প্রভাবিত করবে। বাইডেন বিশ্বাস করেন যে আমেরিকার স্বার্থ নিহিত মিত্রতা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মধ্যে। তার প্রধান মিত্র বিশেষত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় আমেরিকার প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করতে তিনি সচেষ্ট হবেন। চতুর্ভুজীয় সুরক্ষা সংলাপ (কোয়াড) সম্প্রসারণের বিষয় তার বিবেচনায় থাকবে, যার সঙ্গে আমেরিকা, জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়াসহ দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের মতো অন্যান্য এশীয় দেশ যুক্ত রয়েছে।
জাপান ও ভারত বাইডেনকে নিয়ে কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন। এর যৌক্তিকতা মেলে জাপানের সতর্কতার মাধ্যমে। জাপানি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপে প্রধানমন্ত্রী সুগা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই গুরুতর হওয়ার ব্যাপারে জোরালোভাবে সতর্ক করেন। এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তার এই সোজাসাপটা বক্তব্যের জবাবে বাইডেন জাপানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিষয়ে ও কয়েক দশকের পুরোনো ওয়াশিংটন-টোকিও চুক্তিগুলো মেনে চলা নিয়ে নিজের গভীর প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেন বলে জানান। বাইডেনের ঘোষিত কার্যতালিকায় চীনকে সামরিকভাবে মোকাবিলার কথা নেই। তবে তিনি ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধকে অযৌক্তিক মনে করেন এবং তিনি এই ব্যাপারে চীনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার কথা বলেন। চীন সম্পর্কে তার অভিমত হলো, প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে চীনের প্রভাবকে মোকাবিলা করা হবে তার কৌশল।
বাইডেন যদি চীনের সঙ্গে সমঝোতা করে রাশিয়ার সঙ্গে টানাটানিতে লিপ্ত হন তাতে এশিয়ার বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের মতো নাও থাকতে পারে। ইসরাইলের কথায় চলেও ট্রাম্প কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যকে দম ফেলার সুযোগ দিয়েছেন। বাইডেন তা নাও করতে পারেন। এশিয়া ও পাশ্চ্যত্যের বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে বাইডেন অবশ্য চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর কথা বলেছেন, বাণিজ্যে চীনকে পেছনে ফেলার কথা বলেছেন। মার্কিন পত্রিকা ফরেন পলিসির ভাষায় বললে, বাইডেন হয়তো চীনের ব্যাপারে কঠোর কিন্তু নতুন শীতলযুদ্ধ তিনি চান না।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারকদের জন্য দক্ষিণ এশিয়া ক্রমান্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এর কারণ অংশত এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। বাইডেন দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন, সেটি হতে পারে আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিযুক্ততা বা এই অঞ্চলের চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসি প্রভাবকে মোকাবিলা করা। নির্বাচনে জো বাইডেনের জয় তালেবানদের জন্য দুঃসংবাদ, যারা আশঙ্কা করছে যে বাইডেন আফগানিস্তানে সীমিত হারে সেনা উপস্থিত রাখতে পারেন। তালেবান এটাও মনে করে যে জো বাইডেন সম্ভবত মার্কিন তালেবান শান্তিচুক্তিতে অটল থাকবে না। ওয়াশিংটনস্থ আফগান রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাশিম ওয়াহদায়িতার মনে করেন, আফগান সরকার স্পষ্টতই চাইবে যে বাইডেন প্রশাসন তালেবানদের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করবে, কারণ তারা বিশ্বাস করে না যে তালেবান আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে বা মানবাধিকারকে সম্মান করে।
৯/১১-উত্তর যুগে পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে ওঠে এবং মার্কিনিদের থেকে সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা পেয়ে আসছে। বাইডেন দেখেছেন, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বেসামরিক সহায়তার পরেও কীভাবে পাকিস্তানের কৌশলগত ক্যালকুলাস পরিবর্তন হয়নি অথবা চীনের প্রতি পাকিস্তানের অবস্থানের কোনো নড়চড় হয়নি। বাইডেন প্রশাসনে পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম এবং বাইডেন সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত ইস্যু, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অর্থ পাচার বিষয়গুলোতে ইসলামাবাদকে চাপ দেবে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সুবিধাকে আরো কমিয়ে দিয়েছে।
বাইডেনের জয় ভারতের বর্তমান শাসক দলের জন্য চিন্তার বিষয় হতে পারে। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনসহ মার্কিন প্রগতিশীলদের সমর্থন দিয়ে বাইডেন যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন তাতে আপাতদৃষ্টিতে এটা মনে হয়, বাইডেনের প্রশাসন চাইবে না তাদের বড় মিত্র হোমফ্রন্টে সংখ্যালঘু নির্যাতন করে যাক কিংবা সংবিধান বদলে ধর্মীয় রাষ্ট্রের চেহারা নিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিসকে ভারতের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা হতে পারে। অধিকন্তু ভারতের কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের আধিপত্য বিস্তার রোধে ও QUAD-এর অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অগ্রাধিকারমূলক সম্পর্ক বজায় রাখবে। এছাড়াও ইন্দো প্যাসিফিক এলাকায় আমেরিকার স্বার্থরক্ষায় ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হওয়ার কারণে এবং রোহিঙ্গা সংকটের ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশ বাইডেন প্রশাসনের নজরে থাকবে। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র সোচ্চার থাকবে। কিন্তু রোহিঙ্গা বিষয়ে ক্রিয়াকলাপের ওপর কার্যকর ও শক্তিশালী চাপ প্রয়োগের নীতি অবলম্বনের সম্ভাবনা কম। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে চীনের কৌশলগত নীতি এবং বেল্ট অ্যান্ড রোডের বাস্তবতায় আমেরিকা বাংলাদেশের ওপর দৃষ্টি রাখবে। অন্যদিকে বাংলাদেশও সন্ত্রাসবাদ দমন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিতে সচেষ্ট থাকবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মানবাধিকার—এমন আরো নানা ইস্যুতে বাইডেন সরকারের অবস্থান বেশ বলিষ্ঠ। বাংলাদেশ এ থেকে উপকৃত হবে।
বাইডেনের জয় বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্পের অনুসৃত বিষয়গুলোকে নতুন করে ভাবার প্রয়াস পাবে। তথাকথিত আমেরিকা প্রথম নীতির মাধ্যমে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে বহুত্ববাদ ও সহযোগিতার মূলে যে কুঠারাঘাত করেছিলেন, বাইডেন প্রশাসন সেটি পুরুদ্ধারে সচেষ্ট হবে এবং এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করবে। ভূরাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় তার অবস্থান সুসংহত করার প্রয়াস পাবে। দক্ষিণ এশিয়ার চীনের আধিপত্য নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সম্পদ বিনিয়োগ করবে। সর্বোপরি এটি মনে করা ঠিক হবে না যে বাইডেনের জয় মানেই রাতারাতি বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতির পট পরিবর্তন হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুত্ববাদ ও সহযোগিতার প্রয়াস অনেক সময় নির্ধারিত হয় সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপটের বাস্তবতায়। এটি মনে রাখা জরুরি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তার জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে নয়। তবে দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বে মার্কিন আচরণ ও কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। সবশেষে উল্লেখ করা যেতে পারে, ভবিষ্যতে বাইডেন প্রশাসনকে অভ্যন্তরীণ গরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে একটি বড়ো সময় ব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাবের নিম্নমুখিতায় রাশ টেনে ধরা তত সহজ হবে না। মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প সিনড্রোম একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখতে পারে। নির্বাচনোত্তরকালে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও Systemic racism-এর বিলুপ্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে মার্কিন রাজনীতি উত্তপ্ত থাকবে, যার সুবিধা চীন কিংবা রাশিয়া পেতে পারে। সর্বোপরি ২০২০ মার্কিন নির্বাচন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন সময় নিয়ে আসছে এ কথা নিশ্চত করে বলা যায়।
লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়