৩৮ কোটি টাকা পাচার

এমপি পাপুল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা

৩৮ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৭ টাকা পাচারের অভিযোগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল, তার ব্যক্তিগত কর্মচারী, মেয়ে ও শ্যালিকাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। 

মামলার এজাহারে ছয়জন ছাড়াও দুই প্রতিষ্ঠানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক পাপুলের ভাই এবং শ্যালিকা। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে এই অর্থ পাচার করা হয়। 

মঙ্গলবার সিআইডির অর্গানাইড ক্রাইম ইউনিটের (ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম) সহকারী পুলিশ সুপার আল আমিন হোসেন বাদী হয়ে পল্টন থানায় মামলাটি দায়ের করেন। 

মামলায় এমপি পাপুল ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- পাপুলের ব্যক্তিগত কর্মচারী মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান ওরফে মনির (৩৫), পাপুলের শ্যালিকা জেসমিন প্রধান (২৩), মেয়ে ওয়াফা ইসলাম (২৬), ভাই কাজী বদরুল আলম ওরফে লিটন, টাকা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান ‘জব ব্যাংক ইন্টারন্যাশনালে’র ম্যানেজার গোলাম মোস্তফা (৫৬), জেসমিন প্রধানের প্রতিষ্ঠান জে. ডব্লিউ লীলাবালী এবং কাজী বদরুল আলম লিটনের প্রতিষ্ঠান ‘জব ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল’। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরো ৫/৬ জনকে। 

সিআইডি বলছে, উল্লেখিত আসামি ও প্রতিষ্ঠানসহ অজ্ঞাত আরো ৫/৬ জনের সহযোগিতা ও পরস্পর যোগসাজশে সংঘবদ্ধভাবে মানবপাচারের মাধ্যমে ৩৮ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৭ হাজার টাকা অবৈধ আয় করে। আসামিরা এই অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর, স্থাবর/অস্থাবর সম্পদে রূপান্তর, ভোগবিলাসে ব্যয় ও অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। তবে দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থিত অবৈধ সম্পদের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সন্দেহভাজনদের নামে-বেনামে আরও সম্পত্তি থাকতে পারে বলে সিআইডির ধারণা। 

কুয়েতে অবৈধ মুদ্রা ও মানবপাচারের দায়ে পাপুলের প্রতিষ্ঠান ‘মারাফিয়া কুয়েতিয়া’কে অবৈধ ঘোষণা করে সে দেশ থেকে ১১ জন ভিকটিমকে গত জুনে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

কুয়েত ফেরত ভিকটিমগণ তাদের সাক্ষ্যে পাপুলের ব্যক্তিগত সহকারী মনির ও মগবাজারস্থ ম্যানপাওয়ার প্রতিষ্ঠান ‘জব ব্যাংক ইন্টারন্যাশনালের’ ব্যাংক হিসাবে প্রত্যেকে ৫-৭ লাখ টাকা প্রদানের তথ্য প্রদান করে। ভিকটিমদের মধ্যে আব্দুল আলীম নামে একজন বাদী হয়ে এমপি পাপুল ও মনিরসহ অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে এ সংক্রান্তে মতিঝিল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলাও দায়ের করেছেন। (মামলার নং ৭)।  

এজাহার থেকে জানা যায়, পাপুলের ব্যক্তিগত সহকারী মনির দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কাজের সন্ধানে কুয়েতে গমনেচ্ছু বিভিন্ন ভিকটিমের কাছ থেকে নগদ ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে জনপ্রতি ৫-৭ লাখ টাকা গ্রহণ করেছে। মনিরের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা ও অন্যান্য তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, মনিরের নিজ নামীয় রুপালী ব্যাংকের রাজারবাগ শাখায় ২০১৬-২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কুয়েত গমনেচ্ছু ভিকটিমদের কাছ থেকে মোট ৩৮ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৭ টাকা জমা করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণরূপে এমপি পাপুল, তার শ্যালিকা জেসমিন প্রধান এবং কন্যা ওয়াফা ইসলামের নামে পরিচালিত ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার ও উত্তোলন করা হয়েছে। 

উল্লেখিত মেয়াদে মনিরের ব্যাংকের হিসাব থেকে জেসমিন প্রধানের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের হাতিরপুল শাখার একাউন্টে বিভিন্ন সময়ে অনলাইন একাউন্ট-একাউন্ট ট্রান্সফারের মাধ্যমে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং চেকের মাধ্যমে আরও ৮ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা সর্বমোট ১১ কোটি ৮৭ লাখ ২০ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। 

এছাড়াও মনিরের ব্যাংক হিসাব থেকে জেসমিন প্রধানের নাম-সর্বস্ব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান জে. ডব্লিউ. লীলাবালীর এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের হাতিরপুল শাখার একাউন্টে বিভিন্ন সময়ে চেকের মাধ্যমে আরও ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। অথচ জেসমিন প্রধানের সাথে এমপি পাপুলের সহকারী মনিরের কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্কের অস্তিত্ব পায়নি সিআইডি। 

মামলার এজাহারে এমপি পাপুলের ব্যক্তিগত সহকারীর ব্যাংক একাউন্ট থেকে পাপুলের অন্যান্য আত্মীয়দের একাউন্টে কখন, কিভাবে, কতো টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে, এর সবই উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পাপুলের শ্যালিকা ও ভাই’র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিকটিমদের কাছ থেকে কিভাবে, কতো টাকা করে নিয়ে তাদের কুয়েত পাঠানো হয়েছে তাও উল্লেখ করা হয়েছে।  

এজাহারে উল্লেখ করা হয়- পাপুল, তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম, কন্যা ওয়াফা ইসলাম, শ্যালিকা জেসমিন প্রধান ও ব্যক্তিগত কর্মচারী মনিরের বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে হিসাবের শুরু থেকে চলতি বছরের গত মাস পর্যন্ত সর্বমোট ৩৫৫ কোটি ৮৬ লাখ ২৯ হাজার ৬৭০ দশমিক শূন্য ৬ টাকা জমার তথ্য পায় সিআইডি। এই টাকা মানবপাচারের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছে বলে সিআইডি মনে করছে। তবে কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তা আরও তদন্তের মাধ্যমে নিরূপণ করা সম্ভব হবে। হিসাবগুলোতে বর্তমানে সর্বমোট স্থিতির পরিমাণ ১ কোটি ৩০ লাখ ১৯ হাজার ৭০৩ দশমিক ৬০ টাকা।

ইত্তেফাক/জেডএইচ