এই উপমহাদেশে ওয়াজ-মাহফিলের ধারা বহুকাল আগে থেকেই চলে আসছে। বর্তমানের পির মাশায়েখ হক্কানী ওলামায়ে কেরাম এবং ইসলামিক স্কলারগণ তাদের বয়ান ও আলোচনার মাধ্যমে ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা ও আত্মশুদ্ধির কাজ আঞ্জাম দিয়ে চলেছেন।
প্রতিটি মাদ্রাসা, মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে এখন ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হয়ে থাকে। মাহফিলগুলো কোন আঙ্গিকে হওয়া উচিত এবং বয়ানের সহিহ্ তরিকা কী? এসব বিষয়ে জানার জন্য চট্টগ্রাম ফটিকছড়ি জেলার জামেয়া উবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও পির সাহেব নানুপুর আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীনের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা।
ইত্তেফাক : মুহতারাম, ওয়াজ মাহফিলগুলো আমরা কোন উদ্দেশ্যে আয়োজন করবো এবং এর লক্ষ্য কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন : দেখুন, বান্দার প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমাদের জীবন সাজানো উচিত। যেহেতু ওয়াজ মাহফিল দ্বীন প্রচারের একটি ব্যবস্থা, এক্ষেত্রেও যেন আমাদের এখলাস ও নিষ্ঠাপূর্ণ নিয়তের বিচ্যুতি না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোনো রকম যশ-খ্যাতির উদ্দেশে হলে আমাদের সব পরিশ্রম বিফল হবে। হাদিসের আলোকে যদি আমরা দেখি তাহলে আমাদের মাহফিলগুলোর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত- মানুষকে ইহ-পরকালীন কল্যাণের পথনির্দেশ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। বায়হাকী শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে- রসুলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শুধু ওই আমল কবুল করেন, যা তার সন্তুষ্টির উদ্দেশে হয়ে থাকে।’
ইত্তেফাক : আগেরকার দিনের মাহফিলগুলো এবং বর্তমান সময়ের মাহফিলগুলোর মধ্যে আপনি কোনো পার্থক্য দেখেন কি?
আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন: এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে- আমাদের বর্তমান মাহফিলগুলোতে আগের মতো সেই প্রভাব আর লক্ষ করা যায় না। আমাদের পূর্বসূরি বক্তাদের যেরকম ইল্ম ছিল, তেমনি আমলও ছিল। তাঁদের মাঝে ইখলাস লিল্লাহিয়তের কোনো ঘাটতি ছিল না। তাঁরা নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে দেশের আনাচে-কানাচে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁদের প্রতিটি কথা ধর্মপ্রাণ মুসলমান লুফে নিয়ে আমলে পরিণত করতেন। সাদামাটা সহজ সরল লৌকিকতাহীন সে ওয়াজগুলো খুবই কার্যকরী ছিল। বর্তমান সময়ের মাহফিলগুলোতে সেধরনের প্রভাব পরিলক্ষিত না হলেও ফায়দা যে হচ্ছে না তা কিন্তু বলা যাবে না। দেখুন, সমাজ যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে মাহফিলগুলো থেকে খুলুসিয়ত এবং লিল্লাহিয়তের ততটাই ঘাটতি হচ্ছে যা কাম্য নয়। আমাদের আমল-আখলাকে পরিবর্তন আনার জন্যে মাহফিলগুলো আরো ব্যাপক পরিকল্পনা করে সাজানো উচিত বলে আমি মনে করি।
ইত্তেফাক : বক্তাদের মধ্যে কী ধরনের গুণ থাকা আবশ্যক বলে আপনি মনে করেন?
আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন: প্রাথমিকভাবে বক্তাদের পাঁচটি গুণের অধিকারী হওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি- ১. বক্তার অগাধ ইল্ম থাকতে হবে, কেননা ইল্মহীন ব্যক্তি সঠিক ও বিশুদ্ধ বয়ান করতে সক্ষম নন। ২. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীন প্রচারের উদ্দেশে বয়ান করা আবশ্যক, নিজের দিকে আকৃষ্ট করার নিয়ত যেন বক্তার না থাকে। ৩. বক্তা যা বয়ান করবেন নিজে যেন তা আমল করেন। কেননা আমলহীন বক্তার বয়ানে শ্রোতাদের মাঝে কোনো প্রভাব পড়ে না। ৪. বক্তা শ্রোতাদের প্রতি দয়ার্দ্র ও বিনয় হয়ে কথা বলা উচিত। আমার পিতা মওলানা জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)-কে সবসময় দেখেছি- তিনি খুব দয়ার্দ্র ও মিষ্ট ভাষায় বয়ান করতেন। তাঁর বয়ান শ্রোতাদের মাঝে খুব প্রভাব ফেলতো। ৫. বক্তার ধৈর্যশীল ও সহনশীল হওয়া আবশ্যক।
ইত্তেফাক : বয়ানে কী ধরনের বিষয় প্রাধান্য দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন: ইমাম গাজালী (রহ) রচিত স্বীয় গ্রন্থ ‘আইয়্যুহাল ওয়ালাদ’-এ উল্লেখ করেছেন- ‘ওয়াজকারীদের ওয়াজ দ্বারা যেন উদ্দেশ্য হয় মানুষকে দুনিয়া হতে আখেরাতের প্রতি, গোনাহ থেকে নেকীর প্রতি, লোভ থেকে পরিতুষ্টির প্রতি আহ্বান করা।’ এরই ভিত্তিতে বক্তাগণ শ্রোতাদেরকে পরকালীনমুখী ও দুনিয়াবিমুখ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন। ইবাদত-বন্দেগী, তাকওয়া অবলম্বন ও সুন্নাতের অনুসরণের দীক্ষা দেবেন। সর্বোপরি আত্মিক অবস্থা পরিবর্তনের শিক্ষা দেবেন। যে বক্তা এরূপ উদ্দেশ্য ছাড়া ওয়াজ করবেন, তার ওয়াজে কোনো ফায়দা হবে না। দ্বীনদার মুসলমানগণ যেন এ রকম বক্তা ও ওয়াজ পরিহার করে চলেন, এটাই থাকবে আমার পরামর্শ।
ইত্তেফাক : বয়ানে হাসি-তামাশামূলক আলোচনা কতটা সংগত?
আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন: একটি দ্বীনী মাজলিসে মানুষকে হাসানো সম্পূর্ণ অনুচিত। একান্ত কোনো উপমা পেশ করতে গিয়ে যদি মুচকি হাসি এসে যায় তা দোষের নয়। তবে আজকাল কিছু কিছু বক্তা শ্রোতাদের যেভাবে হাসির খোরাক যুগিয়ে থাকেন এতে ওয়াজের প্রাণ থাকে না। বয়ানের ভাষা মার্জিত ও শালীন হওয়া উচিত। অপ্রাসঙ্গিক কথা অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।
ইত্তেফাক : বয়ান করার জন্য কন্ট্রাক্ট বা বক্তার পারিশ্রমিক দাবি করা জায়েয আছে কি?
আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন: দ্বীন প্রচারে কন্টাক্ট বা পারিশ্রমিক দাবি করা কোনোটাই জায়েয নেই। তহে বক্তা এবং আয়োজকদের নীয়ত সহীহ্ হলে হাদিয়া গ্রহণ জায়েয আছে। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে তা যেন দরকষাকষির পর্যায়ে না যায়। পথ খরচ নেওয়া বক্তার জন্য বৈধ আছে।
সাক্ষাত্কার গ্রহণে: মুফতি মীযানুর রহমান রায়হান
ইত্তেফাক/জেডএইচ