দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
একটা সময় জুনায়েদ সিদ্দিকীকে ছাড়া জাতীয় দল কল্পনা করা যেত না।
হঠাত্ করেই সেই সময়টা অতীত হয়ে গেল। ২০১২ সালে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর যেন হারিয়েই গিয়েছিলেন। গত বছর তিনেক ধরে জাতীয় ক্রিকেট লিগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে বেশ ভালো পারফরম করছিলেন। কিন্তু আলোচনায় আসতে পারছিলেন না। অবশেষে জুনায়েদ শিরোনামটা দখল করে নিতে পারলেন। অবশেষে বিপিএল দিয়ে প্রত্যাবর্তন হলো সেই জুনায়েদ সিদ্দিকীর।
যদিও তার এবারের লিগে সেরা ইনিংসটায় খুলনা টাইটান্সের জয় আসেনি বলে মনটা একটু খারাপ। তারপরও বিপিএলে ধারাবাহিকভাবে পারফরম করার সন্তোষটা লুকালেন না। উচ্ছল কণ্ঠেই বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। ভালো রান করতে পারছি। আমি সবসময়ই ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করি। তারই ফল পাচ্ছি হয়ত। গত বছর তিনেক ধরেই ভালো রান পাচ্ছি। কিন্তু বিপিএলে রান পাওয়াটা একটা বিশেষ কিছু। কারণ এই টুর্নামেন্টটা সবাই নজর দিয়ে দেখে। এখানে ভালো করতে পেরে তাই বিশেষ ভালো লাগছে।’
জুনায়েদের জন্য টি-টোয়েন্টিটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। আরও ভালো করে বললে বলা যায়, এই দেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি তারকা তিনি। বাংলাদেশে ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। সেখানেই সেঞ্চুরি করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এরপর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি অভিষেকে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৭১ রানের ইনিংস। টেস্ট অভিষেকেও ডানেডিনের মতো কঠিন কন্ডিশনে দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৪ রান করেছিলেন। জাতীয় দলে জায়গা পাকা করে নিতে একটু সময় নেননি জুনায়েদ।
গতকাল আলাপ করতে গিয়ে বলছিলেন, টি-টোয়েন্টিই তার মূল পরিচয়। যদিও এখন ম্যাচ খেলার সুযোগ না হওয়ায় এই ফরম্যাটে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে কষ্ট হয়। তারপরও নিজের প্রিয় ফরম্যাটটাকে ভোলেননি তিনি, ‘আমাকে তো লোকজন চিনেছিলই টি-টোয়েন্টি দিয়ে। ওই সেঞ্চুরি করেই জাতীয় দলে সুযোগ পেলাম। অবশ্য এখন আমাদের বিপিএলের বাইরে টি-টোয়েন্টি খেলার সুযোগ নেই। গত বছর বিপিএলেও সুযোগ পাইনি। তাই নিজেকে তৈরি রাখাটা কঠিন। তারপরও আমি ফরম্যাটটা পছন্দ করি। চেষ্টা করি, যখনই সুযোগ পাই, পজিটিভ ব্যাটিং করার।’
এই ইতিবাচক ব্যাটিং করেই কুমিল্লার বিপক্ষে ৭০ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছেন জুনায়েদ। এবারের বিপিএলে গতকালকের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান (১৯১) জুনায়েদ সিদ্দিকীর। শুধু তাই না, টুর্নামেন্টে অন্তত ৬০ রান করা বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটও (১৪২.৫৩) জুনায়েদের। এবারের বিপিএলে জুনায়েদ সিদ্দিকী একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি নিজ দলের প্রতিটা ম্যাচেই দুই অঙ্কের ঘরে রান করেছেন—৭০, ১৪, ২০, ২৩, ৩১, ৩৩।
বিপিএল ইতিহাসে টপ ৫০ জন ব্যাটসম্যানের মধ্যে ২০-এর বেশি ব্যাটিং গড় এবং ১৩০-এর বেশি ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট আছে মাত্র দুইজন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের। তারা হলেন সাকিব আল হাসান এবং জুনায়েদ সিদ্দিকী।
অথচ এই জুনায়েদকে গত বিপিএলে প্রয়োজনই মনে করেনি কোনো দল। তাহলে এবারের পারফরম্যান্সটা কী সেই ফ্রাঞ্চাইজি কর্তাদের প্রতি একটা জবাব দেওয়া হলো?
জুনায়েদ এইসব জবাবের দিকে যেতে চান না। তিনি অত্যন্ত নিরীহভাবে নিজের কাজটা করে যেতে চান। বলছিলেন, ‘আমি জবাব-টবাব নিয়ে ভাবি না। আমি ভাবি, আমারই কোনো দুর্বলতা ছিল বলে আমি হয়ত ডাক পাইনি। আসলে মানুষের চ্যালেঞ্জটা নিজের সঙ্গেই। আমি গত কয়েক বছরে বুঝতে পেরেছি যে, নিজের সঙ্গে যদি কোনো প্রতারণা না করা হয়, তাহলেই মানুষের খুশি থাকার কথা। আমি ক্রিকেট খেলি। সেই কাজটা খুব সততার সঙ্গে করি। তারপর কী ফল পেলাম, সে নিয়ে ভাবি না।’
এই একইরকম নির্লিপ্ততা তার জাতীয় দল নিয়েও। জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সুযোগ পেতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই তার কণ্ঠে, ‘আমি যেহেতু হাল ছাড়িনি, জাতীয় দলের স্বপ্ন তো দেখিই। এভাবে পারফরম করে যেতে চাই। তারপর কখনো সুযোগ এলে নিজেকে নতুন করে তুলে ধরতে চাই। সুযোগ না পেলেও কোনো সমস্যা নেই।’