কোন শ্রেণির ব্যক্তিরা সঞ্চয়পত্র কিনছেন বা কারা সঞ্চয়পত্র বেশি কিনছেন তা জানে না সঞ্চয় অধিদপ্তর। এ বিষয়ে আগে কোনো কাজ, গবেষণা বা ডাটাবেইজ না থাকায় সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এ অধিদপ্তরের কাছে নেই তেমন কোনো তথ্য। তাই এবার তৈরি হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের ডাটাবেইজ। আর ডাটাবেইজ তৈরি হয়ে গেলে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য আয়কর সনদ (টিআইএন) ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
এবার আওয়ামী লীগ সরকার একটানা তৃতীয়বার সরকার গঠন করে দুর্নীতি দমনে উদ্যোগ নিচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে সঞ্চয়পত্র খাতও দুর্নীতিমুক্ত করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কারণ, ধারনা করা হয় দুর্নীতি করে আয় করা অর্থের বড় একটা অংশ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়। সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর বলছে, সঞ্চয়পত্র খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ (কালো টাকা) বন্ধে সঞ্চয়পত্রে এনআইডি ও টিআইএন যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে এ বিষয়ে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর চুক্তি করবে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শামসুন্নাহার বেগম এ বিষয়ে জানান, সঞ্চয়পত্র খাতে টিআইএন অন্তর্ভুক্ত করতে এনবিআরের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। শিগগিরই চুক্তিও হবে। সমপ্রতি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক বৈঠকে সঞ্চয়পত্র খাতে টিআইএন সনদ ও এনআইডি বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান তিনি।
অধিদপ্তরসূত্রে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রের ডাটাবেজ তৈরি হচ্ছে। এ ডাটাবেইজের সঙ্গে সহজেই টিআইএন যুক্ত করা যাবে। তবে অনেকেই বলছেন, সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করলে বিনিয়োগকারীদের বিড়ম্বনা বাড়বে। তবে তাতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, কালো টাকার একটা বড় অংশ সঞ্চয়পত্র খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। আর সঞ্চয়পত্র কিনছে ধনীরাই। সাধারণ বা স্বল্প আয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীদের সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে ৯০ শতাংশ সঞ্চয়পত্র কিনছেন বড় পদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনীতিবিদ ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। ৮৫ শতাংশ সঞ্চয়পত্র মাত্র ১২ শতাংশ লোকের কাছে বিক্রি হচ্ছে। আর মাত্র ১৫ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে বাকি ৮৮ শতাংশ লোকের কাছে।
ব্যাংকের পরিচালকদের সংগঠন বিএবি’র উদ্যোগের কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকে ব্যাংক আমানতের সুদের হার কমে গেছে। আবার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেও খুব বেশি ভরসা পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এমন অবস্থায় সঞ্চয়পত্রই একমাত্র ভরসা। অন্যদিকে ব্যাংকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মুনাফা পাওয়া অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে বেশি সুদ পাওয়া যায় এতে বিনিয়োগ করছেন তারা। বিক্রির মাত্রা বেড়ে যাওয়া পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের সংকট দেখা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
সঞ্চয়পত্রে জনসাধারণের বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ার ফলে মুদ্রা বাজারে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে বলে মনে করে মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির মতে, সুদহার বেশি হওয়ায় সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশই আসছে এ খাত থেকে। এতে বাজারে সুদহার কমানো যেমন সহজ হচ্ছে না, তেমনই সরকারের বেশি সুদবাহী দায় বাড়ছে। অন্যদিকে বন্ড মার্কেট উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না হলেও অব্যাহতভাবে বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের (জুলাই-নভেম্বর) প্রথম পাঁচ মাসে ২১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। যা এই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের ২৩ মে’র পর থেকে এ হার কার্যকর আছে। এর আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি।