র্যাগিং শব্দটির বিভিন্ন আভিধানিক অর্থ থাকলেও র্যাগিং বলতে যা বুঝানো হয় তা হলো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরাতন অর্থাত্ সিনিয়রদের সঙ্গে নবীন শিক্ষার্থীদের পরিচয় পর্বের প্রথা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটা কি শুধুই পরিচয় পর্ব? নাকি পরিচয় পর্বকে পুঁজি করে এর পেছনে চলে ভয়াবহ নৃশংসতা, অমানবিক নির্যাতন।
আমাদের দেশে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি কলেজগুলোতেও এর ভয়াবহতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। র্যাগিংয়ের স্বপক্ষে অনেক যুক্তিবাদী দেখেছি, তাদের দাবি; র্যাগিংয়ের মাধ্যমে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের উন্নয়ন হয়। যুক্তিবাদী ভাইটিকে যদি জিজ্ঞাস করি সম্পর্কের উন্নয়নের মাধ্যম কি বর্বরতা নাকি নির্মম নির্যাতন? পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে যেখানে প্রত্যেকটা সম্পর্কের শুরু, সেখানে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে আপনারা বেছে নিয়েছেন র্যাগিং নামের নোংরামিটাকে! আজকাল র্যাগিংয়ের ক্ষেত্রে যা চলে তা নোংরামিতেই ভরপুর।
অশ্লীল কথাবার্তা বলা, কানধরে উঠবস করানো, মুরগি হয়ে বসিয়ে রাখা, ব্যাঙ দৌড়ে বাধ্য করা, বুকডন দিতে বাধ্য করা, সিগারেট, গাঁজা, মদ্যপানে বাধ্য করা,অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করানো, সবার সম্মুখে নগ্ন করে নাচানো, সবার সম্মুখে চরম অশ্লীল বই পড়তে বাধ্য করা, যৌন অভিনয়ে বাধ্য করা, শিক্ষার্থীর পিতা-মাতা ও পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার, ম্যাচের কাঠি দিয়ে রুম অথবা মাঠের মাপ নেওয়া, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মাপ নেওয়া, অপরিচিত মেয়ে অথবা ছেলেকে প্রকাশ্যে প্রেমের প্রস্তাব দিতে বাধ্য করা, শীতের মধ্যে পানিতে নামানো ও ফুটবল খেলতে বাধ্য করা, রাতে মশার কামড় খাওয়ানোর জন্য বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখাসহ বিভিন্ন কায়দায় অমানবিক নির্যাতন করেও ক্ষান্ত হয় না। আদেশ না মানলে গায়ে হাত তোলাও এক্ষেত্রে অতি স্বাভাবিক ব্যাপার।
আপনার সামান্য পৈশাচিক আনন্দ উপভোগের বস্তু কোনো শিক্ষার্থী হতে পারে না। মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন; এ স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার কারো নেই। মানুষের এ অধিকার খর্ব করা যেমন মানবাধিকার পরিপন্থি, তেমনি বাংলাদেশের সংবিধান অবমাননারও শামিল। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছে।
আপনি আপনার সিনিয়রত্বের সুযোগ নিয়ে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে সাময়িক উন্মাদনা পাবেন, কিন্তু র্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীর আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ পেতে আপনি ব্যর্থ। ভালোবাসা দিয়েই ভালোবাসা অর্জন করে নিতে হয়। র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্তসহ কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মারা যাবার ঘটনা পর্যন্ত চোখে পড়েছে। পরিচয় পর্ব বা সম্পর্ক উন্নয়নের নামে বর্বর নির্যাতন কখনো সংস্কৃতি হতে পারে না। র্যাগিং মূলত অসুস্থ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছু নয়।
র্যাগিং বিষয়ে বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকলেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সমস্যা নিরসনকল্পে আলাদা আলাদা কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। র্যাগিং-এর শিকার শিক্ষার্থীকে প্রশাসন বরাবর অভিযোগ করার জন্য উল্লেখ আছে কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করতেও ভয় পায়, কারণ প্রশাসন অপরাধীকে সাময়িক শাস্তি দিলেও নির্যাতিত শিক্ষার্থীর সার্বিক নিরাপত্তা দিতে অক্ষম।
র্যাগিং নামক অপ-সংস্কৃতিকে সমূলে উত্পাটন করতে হলে সরকারের উচিত কঠোর আইন প্রণয়ন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং এ ব্যাপারে তরুণ সমাজের সচেতন ভূমিকা ও সকলের সোচ্চার হওয়া জরুরি।
n লেখক:শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়