সমগ্র দেশে এখন চলিতেছে মাদকের মৌসুম। করোনা মহামারির শুরুতে লকডাউনের মধ্যে মাদক ব্যবসা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণে ছিল; কিন্তু এখন মাদকের ব্যবসা আবার রমরমা হইয়া উঠিয়াছে। পার্শ্ববর্তী দেশ, বিশেষত মিয়ানমার হইতে এই দেশে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নানা প্রকার মাদকদ্রব্যের চালান আসিতেছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল খ্যাত (মিয়ানমার, চীন, লাওস ও থাইল্যান্ড) অঞ্চলের সন্নিকটে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারিরা এই দেশকে সহজেই গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসাবে ব্যবহার করিতেছে। এই মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা দ্রুত বাড়িতেছে। ইহাতে দেখা যাইতেছে সামাজিক ও পারিবারিক নানা অস্থিরতা। ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। ইহাতে ৪৬৬ জন বন্দুকযুদ্ধের শিকার হয়। তাহা সত্ত্বেও দেশে মাদকের থাবা বিস্তার করিয়া চলিয়াছে।
উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন তৈরি ও খোদ প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে সর্বাগ্রে। ডোপ টেস্ট এই ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসাবে পরিগণিত হইতেছে। ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রথমে পুলিশে ডোপ টেস্ট শুরু করেন মুন্সীগঞ্জের তত্কালীন পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তাহার পথ ধরিয়া সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে মাদকমুক্তির অভিযান শুরু হইয়াছে। তিন দফায় ডোপ টেস্টের মাধ্যমে পজিটিভ রিপোর্ট আসিলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চাকুরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে। এই পর্যন্ত ২৫ জন পুলিশ সদস্যকে চাকুরিচ্যুত করিবার মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনে দেওয়া হইয়াছে একটি সতর্ক বার্তা। যেই সকল পুলিশ মাদক কারবারিদের সহিত জড়িত তাহাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হইতেছে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসীয় ও উত্সাহব্যঞ্জক। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিলে ইহার সুফল আগামী কয়েক বত্সরের মধ্যেই পাওয়া যাইবে বলিয়া আশা করা যায়।
বর্তমানে দেশকে মাদকমুক্ত করিতে হইলে এই ডোপ টেস্টের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। আশার কথা হইল, কারারক্ষীদেরও এখন ডোপ টেস্টের মুখোমুখি করা হইতেছে। কারাগার সংশোধনাগার হইলেও এখানে মাদকসেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াটা উদ্বেগজনক। জানা যায়, ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৭০ হাজার বন্দি থাকিলেও তাহার মধ্যে ২৫ হাজারই মাদক মামলার আসামি। তাহাদের অনেকে কারাগারের মধ্যেই মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসা করিয়া যাইতেছে। কারারক্ষীদের যোগসাজশ ছাড়া ইহা কীভাবে সম্ভব? ইহাও জানা যায়, অনেক সময় আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময় স্বজন বা বন্ধুদের নিকট হইতে মাদক সংগ্রহ করিয়া পেট বা পায়ুপথে বহনের কারণে কারাগারে প্রবেশের সময় তাহাদের শরীর তল্লাশি করিবার সময়ও তাহা ধরা পড়ে না। এই জন্য কারাগারগুলিতে মাদক শনাক্তের স্ক্যানিং মেশিন স্থাপন করা প্রয়োজন। মাদকাসক্ত বন্দিদের নজরদারি করিতে গিয়া যেই সকল কারারক্ষী মাদকাসক্ত হইয়া পড়ে এবং তাহাদের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাহাদের ডোপ টেস্ট করা সবচাইতে জরুরি।
পুলিশ বিভাগে ও কারারক্ষীদের মধ্যে মাদকমুক্তির অভিযানকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে সমাজের নানা শ্রেণির লোকের মধ্যে মাদকাসক্তির যে হার বাড়িতেছে, তাহাতে ডোপ টেস্টের আওতা বৃদ্ধির বিকল্প নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও ফাইনাল পরীক্ষার পূর্বে, সকল প্রকার সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে, পরিবহন খাতে, বিবাহ-শাদির পূর্বে ইত্যাদিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। ইহাকে দিতে হইবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। সমগ্র দেশে বাড়াইতে হইবে ডোপ টেস্ট ল্যাবের সংখ্যা। এই জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নও আবশ্যক।