পাথরঘাটা (বরগুনা) সংবাদদাতা
বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের উপকূলীয় এলাকা বরগুনার পাথরঘাটায় অবস্থিত লালদিয়া বন। এ বনের পূর্বে বিষখালী আর পশ্চিমে বলেশ্বর নদী ও সাগরের মোহনা এ বনকে ঘিরে রেখেছে। এ বনের পূর্বপ্রান্তে সমুদ্র সৈকত। সমুদ্র সৈকতটি বেশ ছোট হলেও সৌন্দর্যে কোনো অংশে কমতি নেই। বিভিন্ন বৃক্ষরাজির সুবাদে এ বনের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। এখানে বিভিন্ন রকমের পাখির কলকাকলি এবং সমুদ্রের গর্জন শুনে পর্যটকরা হবেন বিমোহিত। দৃষ্টিনন্দন ঘন বন আর সবুজে সবুজে ছাওয়া এ বনের সৌন্দর্যকে আরো আকর্ষণীয় করেছে পাশের সুবিশাল তিনটি সৈকত। তবে এখানে নেই কোনো হিংস্র প্রাণী। আছে হরিণ, বনমোরগ, বানর, শূকর, গুইসাপ। এ ছাড়াও রয়েছে প্রায় ৩৫ প্রজাতির পাখি আর বন্যপ্রাণি।
সাগরের নোনা জল এসে আছড়ে পড়েছে বালুকাবেলায়। উড়ে যায় গাংচিল আর লাখ লাখ লাল কাঁকড়ার দল ছুটে বেড়ায় বেলাভূমিতে। চরের বালুতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে লাল কাঁকড়ার ঝাঁক। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই মুহূর্তে আবার গর্তে ঢুকে যায়। সে এক নান্দনিক দৃশ্য। এভাবে রাতদিন লুকোচুরি খেলতেও ওদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে না। মনকাড়া অনুভূতি যা আপনাকে আবারো কাছে টানবে বার বার। এ ছাড়াও একদিকে সুন্দরবন আরেক দিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ। সূর্যাস্ত সূর্যোদয়ের দৃশ্য অবলোকনের জন্য এর চেয়ে উপযোগী স্থান আর বুঝি নেই।
এ চরটি সুন্দরবনের খুব কাছে থাকায় পর্যটকরা সহজেই সুন্দরবনের সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে পারবেন। এখানকার বনের মেছোবাঘ, হরিণ, বানরসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণি সহজেই পর্যটকদের মনে দোলা দেবে। কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা অনেক পর্যটক ট্রলার নিয়ে এখানে আসেন। উপভোগ করেন প্রাকৃতিক নিসর্গ। প্রকৃতিক মনোরম পরিবেশ, আবহমান বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য এ লালদিয়ার চরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকার কারণে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। তাই ভ্রমণবিলাসীদের কাছে অজানাই থেকে যাচ্ছে সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিটি।
লালদিয়া সৈকতের পাশেই রয়েছে একটি শুঁটকি পল্লি। সৈকত ঘেরা লালদিয়ার চরে বছরে কার্তিক মাস থেকে শুরু হয়ে ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে শুঁটকি উত্পাদন। এখানে যে শুঁটকি প্রস্তুত করা হয় তার ৯০ ভাগই হয় হাঁস-মুরগির খাদ্যের জন্য, বাকি ১০ ভাগ মানুষ খায়। প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে শুঁটকির কারবার চলে আসছে। এর পাশেই রয়েছে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে প্রাকৃতিকভাবে জেগে ওঠা সোনাকাটা বন। নবগঠিত সোনাকাটা ইউনিয়নের অন্তর্গত এ দ্বীপটি ‘সোনাকাটা বন’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। মন ভোলানো অনেক দৃশ্য চোখে পড়বে এখানে। বনের পূর্বে কুয়াকাটা, পশ্চিমে সুন্দরবন আর হরিণঘাটা, উত্তরে বিশাল রাখাইন পল্লি এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এ বন থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুটিই উপভোগ করা যায়। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া এ বনে রয়েছে নানান প্রজাতির গাছপালা। আছে বিভিন্ন ধরনের পশুপাখির বিচরণ। ফাতরার বনে ইকোপার্ক তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ছোট একটি ডাকবাংলো। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ট্রলারে সোনাকাটা যেতে মাত্র ৩০ মিনিট সময় লাগে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারলে সমুদ্র দেখতে আসা পর্যটকদের কাছে লালদিয়ার চরটিও সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
বন বিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের মত লালদিয়ার চরটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে পর্যটকদের কাছে।