পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ কাজই থাকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে। বেসিক কোর্স সম্পন্ন করার পর তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঢাকার হেড অফিসে কাজ করেন। কিছুদিন পর পোস্টিংয়ে চলে যান নানা দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে। চাকরির ধরনের কারণেই এমনটি হয়ে থাকে। পরে চাকরির সুবাদে হয়তো এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতে হয়, তবে সেই ঘুরে বেড়ানোর তালিকায় বেশির ভাগই থাকে বিদেশের নাম।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একেকজন কর্মকর্তা বিদেশি মিশনে কর্মরত অবস্থায় দেশকে তুলে ধরেন, লাল-সবুজের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। কাজেই এসব কর্মকর্তার বাংলাদেশ সম্পর্কে আপডেটেড তথ্য থাকা জরুরি। বিশেষ করে গত ১২ বছরে দেশে যত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে, তার সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে বিদেশে নেগোসিয়েশন করতে সুবিধা হবে।
২. স্বাধীন বাংলাদেশের বাজেট ৫০৭ কোটি টাকা থেকে এখন ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকায়; ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকায় বাস্তবায়িত হচ্ছে এই অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, যা স্বাধীনতার পরের বছরে ছিল মাত্র ৫০১ কোটি টাকায়। যেসব কর্মকর্তা দেশের বাইরে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে যাবেন, তাদের দেশের এসব উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে বাস্তবিক জ্ঞান থাকা দরকার। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়ে রূপপুরে যাই। এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে চাই, আমরা ঠিক করেছি যে বিদেশে দায়িত্ব পালনের আগে নতুন রাষ্ট্রদূতেরা ঐ দেশে গিয়ে আগামী দুই বা তিন বছর কী ধরনের কাজ করবেন, সে বিষয়ে সংসদীয় কমিটির কাছে প্রেজেন্টেশন দেবেন। আবার রাষ্ট্রদূতেরা বর্তমানে দেশে ফিরে এসে ডি ব্রিফিং করছেন। এর মাধ্যমে জবাবদিহি বাড়ছে।
আরও পড়ুন : মুজিববর্ষে ঘর পাচ্ছে ৯ লাখ পরিবার
৩. বহুকাল আগে থেকেই উত্তরাঞ্চলের দিকে পদ্মাপাড়ের এই জনপদ দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখানে রয়েছে পদ্মা নদীর ওপর স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী রেল সেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের নামে নির্মিত লালন শাহ সেতু। সম্প্রতি এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরো বহুগুণ বেড়ে গেছে যে কারণে তা হলো, এখানেই স্থাপিত হচ্ছে দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’। রুশ সহায়তায় এ প্রকল্পে দুই ইউনিট মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ৮ হাজারের মতো জনবল এখন এই প্রকল্পে কাজ করছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৮০০ রাশিয়ানসহ বিদেশি জনবল রয়েছে প্রায় ২ হাজার। ব্যয়ের দিক থেকেও এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ তালিকায়, যা প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার, মানে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার মতো।
৪. মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গত নভেম্বরে আমরা যখন রূপপুরে পৌঁছাই, তখন বেলা চড়ে গেছে অনেকটাই। সেখানকার বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখে সবাই দারুণ উচ্ছ্বসিত বোধ করি। করোনার এই মহামারিও রূপপুরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। দিন-রাত নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছে দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্রের কাজ। রূপপুর প্রকল্প এলাকায় ১ হাজার ৬২ একর জমির ওপর চলছে বিপুল কর্মযজ্ঞ। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ও প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ১ হাজার একরেরও বেশি পরিমাণ এলাকা জুড়ে প্রকল্পের কর্মক্ষেত্র।
আরও পড়ুন: উপহারের ২০ লাখ ডোজ টিকা আসছে আজ
৫. মূলত সবকিছু উত্পাদনের ফুয়েল বিদ্যুৎ, উন্নয়নের মাপকাঠিও বিদ্যুৎ। উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে সবার দোরগোড়ায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্র নির্মাণের মেগা প্রকল্প হাতে নেয়। ১৯৬১ সালে পদ্মার তীরে পাবনার রূপপুরে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রকল্পের চেহারা নিতে অর্ধশতক পার হয়ে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ প্রকল্পে গতি আসে; চুক্তি হয় রাশিয়ার সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রোসাটমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি কমিশন। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড ব্যয়ের এই প্রকল্পে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। ইউরেনিয়াম দিয়ে বিদ্যুৎ উত্পাদন নতুন কোনও বিষয় নয়। পৃথিবীর অনেক দেশ এই মৌলিক পদার্থ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উত্পাদন করছে। কয়লা বা ডিজেল দ্বারা বিদ্যুৎ উত্পাদন করলে পরিবেশের জন্য তা হুমকিস্বরূপ। কিন্তু পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উত্পাদন করলে তা পরিবেশবান্ধব। তবে এর প্রাথমিক উত্পাদন খরচটা একটু বেশি, দীর্ঘকালীন উত্পাদনের খরচ সবচেয়ে কম। যে জিনিসটা ভালো, তার মূল্য সাধারণত একটু বেশি হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি সরকারের ব্যয়বহুল প্রকল্প। তবে এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল পাওয়া যাবে। রাশিয়া এ কাজে সার্বিকভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কাজটি সঠিকভাবে এগোচ্ছে। ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যেও বাংলাদেশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে কিংবা ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্ল্যান মাফিক কাজ করে যাচ্ছে। আর এসব কিছুর জন্য প্রয়োজন প্রচুর উত্পাদন। তাই উত্পাদনের চাকা সচল রাখার জন্য চাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। ২০৩০ সালে দরকার ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালে দরকার ৭৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ চাহিদা মেটাতে ২০৪১ সাল নাগাদ ৭৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যার ১০-১২ শতাংশ অর্জিত হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। বিদ্যুৎ উত্পাদনে ব্যবহৃত জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যয় সাধারণত বেশি। বিদ্যুৎ উত্পাদনের ক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তি সবচেয়ে আধুনিক, টেকসই, সাশ্রয়ী ও পরীক্ষিত প্রযুক্তি। তাই জ্বালানি উত্সকে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত পারমাণবিক জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
আরও পড়ুন : ‘মিয়ানমার মনে করছে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া দরকার’
৬. আমরা প্রকল্প এলাকার একেকটা স্লট সময় নিয়ে ঘুরে দেখি, বিস্ময়ে অভিভূত হই। বাংলাদেশ ছাড়াও এ প্রকল্পের নকশা বাস্তবায়নকারী দেশ রাশিয়া এবং প্রকল্প নির্মাণে সহযোগী দেশ ভারতের বিশেষজ্ঞ বাহিনী একত্রে গড়ে তুলছে এক বৃহৎ স্থাপনা। রাত-দিন চলা বিশাল এই কর্মযজ্ঞের জন্য এরই মধ্যে রূপপুর ও আশপাশের এলাকা বদলে যেতে শুরু করেছে। গড়ে উঠেছে নতুন আবাসন, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক কেন্দ্র্র।
এটি বর্তমান সরকারের সাত মেগা প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের মূল কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিট থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদন করা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে আনুমানিক ৩০ শতাংশ আর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে স্বপ্নের রূপপুর প্রকল্পের ইউনিট ওয়ানের যন্ত্রপাতির টেস্টিং শুরু হবে ২০২২ সালে। জ্বালানি সরবরাহ শুরু হবে ২০২৩ সালের শুরুতে। এপ্রিলে শুরু হবে পাওয়ার লোডের কাজ। আশা করা হচ্ছে, ২০২৩ সালের আগেই প্রকল্পটির জ্বালানি ইউরেনিয়াম বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে। সে হিসাবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই জ্বালানি রাখার জন্য সব ব্যবস্থা ও অবকাঠামো তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে এই প্রকল্পের পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, প্রকৌশল চুক্তি ও নির্মাণ শিডিউল অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক কাজ চলছে। পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাবলয় এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের নির্মিত প্রযুক্তির অ্যাকটিভ ও প্যাসিভ সেফটি সিস্টেমের কারণে বিদ্যুৎ উত্পাদনের সময় কোনও ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে না। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে যে কোনও দুর্ঘটনায় এর তেজস্ক্রিয় পদার্থ লোকালয়ে যাবে না। কাজেই এটাকে ঝুঁকিমুক্তই বলা যায়।
আরও পড়ুন: সংসদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি
করোনা মহামারির সময়ে মেগা এই প্রকল্পে তিন রকম পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কাজে যোগ দেওয়ার আগে প্রতিদিন তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। কারো তাপমাত্রা বেশি থাকলে সাত দিনের জন্য বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হচ্ছে। এরপর আবার পরীক্ষা করে সুস্থ মনে হলে তাকে কাজে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়ান ও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আলাদা মেডিক্যাল টিম রয়েছে। সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মানতে ২৪ ঘণ্টার জন্য সূচি করে কর্মীদের আলাদা গ্রুপ করে দেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে যারা আসছেন, তাদের করোনা ভাইরাস পরীক্ষার নেগেটিভ রিপোর্ট সঙ্গে আনতে হচ্ছে। আসার পর বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হচ্ছে।
৭. আমাদের ঘুরে দেখতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে যায়। পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে সোনালি সূর্য। ইতিহাসের সাক্ষী হতে আমরা ক্যামেরায় নানা জায়গার ছবি তুলে রাখি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের গর্ব এবং এ দেশের ইতিহাসের অংশ হিসেবে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটা আমাদের জন্য একটা বড় অর্জন। পারমাণবিক শক্তিকে আমরা নেতিবাচক কাজে ব্যবহারের বিপক্ষে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ বিষয়ে অত্যন্ত সোচ্চার এবং পৃথিবীর মধ্যে এটা অন্যতম দৃষ্টান্ত।
লেখক :পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার