ভেনিজুয়েলায় স্থানীয় সময় বুধবার সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে দেশটির হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সংবাদ বিশ্ববাসীকে গভীরভাবে মর্মাহত করিয়াছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলির খবরে বলা হইতেছে, মৃত্যুর সংখ্যা লক্ষাধিক হইতে পারে। আমরা এই দুর্যোগে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করি। ভেনিজুয়েলার ভূমিকম্পের এই নির্মমতা যেন আমাদের আবারও এই কথা স্মরণ করাইয়া দিল যে, মানুষের সকল পরিকল্পনা ও সক্ষমতার ঊর্ধ্বে এমন কিছু শক্তি রহিয়াছে, যাহার সামনে মানুষ অনেক সময় অসহায় হইয়া পড়ে।
লক্ষণীয় বিষয় হইল, ভেনিজুয়েলা বিশ্বের সবচাইতে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম নহে। তথাপি দেশটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের শিকার হইল। ইহা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বটে। কারণ, বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চল-যাহা দীর্ঘদিন ধরিয়াই ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করিতেছে। বিশেষজ্ঞগণ বারবার সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন, ভারতীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের গতিবিধি এই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সৃষ্টি করিতেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশকে সম্ভাব্য ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে চিহ্নিত করিয়া আসিতেছে।
প্রকৃতপক্ষে ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাহার উপর মানুষের কোনোই নিয়ন্ত্রণ নাই। কখন, কোথায় এবং কত মাত্রায় ইহা আঘাত হানিবে, তাহা নিশ্চিতভাবে পূর্বাভাস দেওয়া এখনো সম্ভব হইয়া উঠে নাই। কিন্তু যাহা মানুষের হাতে রহিয়াছে, তাহা হইল 'প্রস্তুতি'। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রস্তুতির ক্ষেত্রেই আমরা পিছাইয়া আছি। বড় মাত্রার কোনো ভূমিকম্প সংঘটিত হইলে বাংলাদেশের বিশেষত ঢাকা মহানগরের কী ভয়াবহ পরিণতি হইতে পারে, তাহা কল্পনারও বাহিরে! বিশেষজ্ঞগণ আশঙ্কা করেন, ঢাকা শহর মাটির সঙ্গে মিশিয়া যাইতে পারে! সেই ক্ষেত্রে উদ্বেগের বড় কারণ হইল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সরু রাস্তা, ঘনবসতি, দুর্বল ভবন এবং অপর্যাপ্ত উদ্ধার-সামর্থ্য পরিস্থিতিকে করিয়া তুলিতে পারে জটিল ও কঠিন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একসময় সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক বিভীষিকার নাম; কিন্তু ধারাবাহিক সচেতনতা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নতির মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিশ্বের কাছে একটি সফল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ফলে সাইক্লোনে পূর্বের তুলনায় প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়া আসিয়াছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে আমরা এখনো সেই পর্যায়ের প্রস্তুতি গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। নিকট অতীতে বড় ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা নাই বিধায় এই বিষয়টিকে কি আমরা প্রায়োরিটির লিস্টে রাখিবার মর্ম বুঝিতে পারি না? ভূমিকম্পের ভয়াবহতা টিভির পর্দায় দেখিলেও উহাকে কি আমরা স্পেশাল এফেক্টের সিনেমার দৃশ্য মনে করি?
মনে রাখিতে হইবে, এখনো অবধি ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয় নাই। এই জন্য ক্ষয়ক্ষতি কমাইবার একমাত্র উপায় হইল পূর্বপ্রস্তুতি, নিরাপদ অবকাঠামো এবং ব্যাপক জনসচেতনতা। এই ক্ষেত্রে আমরা তাকাইতে পারি বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ দেশসমূহ-বিশেষত জাপানের দিকে। দীর্ঘদিন ধরিয়া কঠোর নির্মাণবিধি, নিয়মিত মহড়া, আধুনিক সতর্কতা ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে জাপানিরা নিজেদের প্রস্তুত করিয়াছে। বাংলাদেশের ন্যায় ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে থাকা দেশগুলির উচিত, এই অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা।
এখন প্রশ্ন হইল, আমরা কী করিব? এই ক্ষেত্রে যেই বিষয়টি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ-তাহা হইল জনসচেতনতা। কারণ, কেবল সচেতন নাগরিকই দুর্যোগকালে নিজের ও অন্যের জীবন রক্ষায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করিতে পারে। পাশাপাশি সর্বদা ইহাও স্মরণে রাখিতে হইবে, সকল প্রস্তুতি সত্ত্বেও মানুষের চূড়ান্ত আশ্রয় একমাত্র সৃষ্টিকর্তার কাছেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন, 'তিনিই তোমাদিগকে স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকার হইতে উদ্ধার করেন' (সুরা আল-আনআম: ৬৩)। অতএব, ভেনিজুয়েলার মর্মান্তিক ভূমিকম্প হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিয়া আমাদের যেমন একদিকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইবে, অন্যদিকে সকল বিপদ-আপদ হইতে রক্ষার জন্য বিনীতভাবে সাহায্য প্রার্থনা করিতে হইবে মহান আল্লাহর নিকট।

