খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তবে তাহা আর ‘খাদ্য’ থাকে না। মানহীন খাবার এক কথায় স্লো পয়জন—যাহা নীরবে ধ্বংস করিয়া থাকে আমাদের জীবনীশক্তি। অপচয় ঘটায় অর্থের। আশার কথা হইল, খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করিবার লক্ষ্যে এইবার দেশের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মান নির্ধারণে স্টিকার পদ্ধতি চালু করিয়াছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। গত বত্সর ২ এপ্রিল একটি খাবার হোটেলে স্টিকার লাগাইয়া এই কার্যক্রমের পরীক্ষামূলক উদ্বোধন করিয়াছিল বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। গত রবিবার এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এই উদ্যোগের আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৫৭টি হোটেল-রেস্তোরাঁর মধ্যে ১৮টিকে ‘এ +’ এবং ৩৯টিকে ‘এ’ গ্রেডের স্টিকার দেওয়া হইয়াছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানাইতেছে যে, কোনো রেস্তোরাঁয় সবুজ স্টিকার লাগানো মানে সেইখানের খাবারের মান ‘এ+’। অর্থাত্ উহার খাবারের মান বেশ ভালো। কোনো রেস্তোরাঁয় খাবারের মান খুব খারাপ হইলে সেই রেস্তোরাঁর সম্মুখে লাগানো থাকিবে কমলা রঙের স্টিকার। কমলা রঙের স্টিকার দেওয়া মানে সেই রেস্তোরাঁকে খাবারের মান উন্নত করিবার জন্য এক মাসের সময় বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে। আমরা আশা করিব নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তদারকির মাধ্যমে এই ধরনের নিম্নমানের রেস্তোরাঁ একমাসের মধ্যে তাহাদের মান উন্নত করিবে। নচেত্ এই ধরনের রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে স্থায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য সংক্রান্ত আইন ও বিধি বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯ এবং বিশুদ্ধ খাদ্য বিধিমালা-১৯৫৭ রহিয়াছে। ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন পাস হইবার পর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গঠন করা হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করিবার লক্ষ্যে বর্তমানে স্টিকারের মাধ্যমে গ্রেডিং সিস্টেমের আওতায় খাবারের মান, বিশুদ্ধতা, পরিবেশ, ডেকোরেশন, মনিটরে রান্নাঘরের পরিবেশ দেখা যাইবার ব্যবস্থা ও ওয়েটারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তিতে রেস্তোরাঁগুলিকে চার ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত করা হইতেছে। ৯০ নম্বরের বেশি স্কোরে সবুজ, স্কোর ৮০ হইতে ৮৯ হইলে নীল, ৫৫ হইতে ৭৯ স্কোর লাভ করিলে হলুদ এবং কোনো রেস্তোরাঁর স্কোর ৪৫ হইতে ৫৫-এর মধ্যে হইলে কমলা রঙের স্টিকারযুক্ত রেস্তোরাঁ হিসাবে গণ্য করা হইবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁর মান কেমন তাহা ক্রেতাদের খাবার পরিবেশনের শুরুতেই জানাইতে হবে। আর ইহার জন্য রেস্তোরাঁর প্রবেশ পথেই বাধ্যতামূলকভাবে লাগাইতে হইবে এইসব স্টিকার। একইসঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমেও ক্রেতাদের সরাসরি রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের ছবি দেখাইতে হইবে। সন্দেহ নাই যে, সামগ্রিকভাবে কাজটি কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নহে।
এমন সাধু উদ্যোগের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় অভিনন্দন ও ধন্যবাদ পাইবে নিঃসন্দেহে। কারণ, আমাদের দেশে মানহীন খাদ্যের কারণে দিন-দিন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন মারণ ব্যাধির প্রাদুর্ভাব বাড়িয়া যাইতেছে। কয়েক বত্সর পূর্বে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ঢাকার বাজারে প্রাপ্ত সব ধরনের খাদ্যের মধ্যে ন্যূনতম ৪০ শতাংশই বিষাক্ত। একইসঙ্গে মনে রাখিতে হইবে, কেবল আইন ও কর্তৃপক্ষই শেষ কথা নহে, প্রতিটি মানুষকেও সচেতন হইতে হইবে নিরাপদ খাদ্য ক্রয় ও গ্রহণের ব্যাপারে।