১৩৬ আমদানি চালানের হদিস নেই

রপ্তানির জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউজের আওতায় শুল্ক সুবিধায় কাপড় আমদানি করা হলেও ওই কাপড় দিয়ে তৈরি গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি হয়নি। ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে ওই কাপড় খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা কমিশনারেট অফিস অনুসন্ধান চালিয়ে ১৩৬টি আমদানি চালানের কাপড়ের হদিস পায়নি। এতে অর্ধশত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে। বড় ধরনের এ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে আশুলিয়ার গনকবাড়ি এলাকার লাইলাক ফ্যাশনওয়্যার নামে একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।  সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও খোলা বাজারে আমদানি করা গার্মেন্টসের ফেব্রিক বিক্রি করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। 

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। তবে শর্ত হলো ওই কাঁচামালে তৈরি হওয়া পণ্যের সবটুকুই রপ্তানি করতে হবে। এজন্য আমদানিকৃত ওই কাঁচামাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বন্ড কমিশনারেট অনুমোদিত নির্দিষ্ট গুদামে বা ওয়্যারহাউজে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে হয়। এটি বন্ডেড ওয়্যারহাইজ নামে পরিচিত। কিন্তু ওই কাঁচামাল কিংবা কাঁচামালে তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হলে সরকারের প্রযোজ্য রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠানই খোলাবাজারে তা বিক্রি করে দেয়। ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা ওই পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না।

সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালে প্রায় ১৩৬টি চালানের কন্টেইনার ভর্তি কাপড় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান। ভ্যাট গোয়েন্দার অডিটের দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করলে কর্তৃপক্ষ এসব মালামাল কারখানা প্রাঙ্গণে দেখাতে পারেননি। এমনকি এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে খালাস হওয়া কাপড়ও  প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ পূর্বে আনা কাঁচামালে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করা হয় বলে কাগজপত্র দাখিল করে। এসব রপ্তানি কাগজ যাচাই করে আমদানিকৃত কাপড় ও বিল অব এন্ট্রির তথ্যের মধ্যে ব্যাপক গরমিল পাওয়া যায়।

শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অফিস সূত্র জানায়, অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী আমদানিকৃত কাপড়ের পরিমাণ ও মূল্যের মধ্যে সাদৃশ্য নেই। দাখিলকৃত কিছু কিছু                  পিআরসিতে (রপ্তানির বিপরীতে প্রাপ্ত বিদেশি মুদ্রা) রপ্তানির গন্তব্যস্থল থেকে না এসে ভিন্ন দেশ থেকে এবং অস্বাভাবিক কম মূল্যে রেমিট্যান্স দেখানো হয়েছে। যেমন রপ্তানি হয়েছে জাপানে, কিন্তু ডলার এসেছে পেরু থেকে। এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। তাছাড়া ২৭টি প্রদর্শিত রপ্তানি চালানের বিপরীতে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসেনি। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, গার্মেন্টস মালিক প্রকৃতপক্ষে পোশাক রপ্তানি না করেই কিছু ক্ষেত্রে নিজের উদ্যোগে ডলার প্রেরণ করে ভুয়া পিআরসি দেখিয়েছেন। অন্যদিকে রপ্তানি শিপিং বিল ও অন্যান্য কাগজপত্রও সন্দেহজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অফিসের কমিশনার ড. মইনুল খান ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে ওইসব কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়েছে। রপ্তানির বিপরীতে সঠিক নথিপত্র দেখাতে পারেনি। এতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছি। এর সঙ্গে অর্থপাচারেরও যোগসূত্র আছে। একই প্রক্রিয়ায় আরও বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের তথ্যও পাওয়া গেছে। সেগুলো এখন অধিকতর তদন্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি।