প্র্যাকটিস করতে বাইরে যান, বদলি করলে যান না

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এই তিন প্রায় ৬০ ভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অনুপস্থিত থাকেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, এটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এই তিন দিন ঢাকার বাইরে প্রাইভেট প্রাকটিস করতে যান। এই তিন দিন সহকারী রেজিস্ট্রার, মেডিক্যাল অফিসার ও ইন্টার্ন চিকিত্সকদের ওপর হাসপাতালের চিকিত্সা নির্ভর করে। অথচ ঢাকার বাইরে বদলি করলে তারা যান না। এমনকি পদোন্নতি দিয়ে বদলি করলেও যেতে চান না অনেকে। বছরের পর বছর ধরে চর দখলের মতো ঢাকায় অবস্থানকারী চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। নানাভাবে ও কৌশলে সব কিছু ম্যানেজ করে তারা বহাল তবিয়তে আছেন ঢাকায়। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে প্রাইভেট প্রাকটিসও করে আসছেন। ঢাকায় অনেক চিকিত্সক সরকারি হাসপাতালে না থেকে দিনের বেলাও প্রাইভেট প্রাকটিস করছেন। ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সকদের অনুপস্থিতির হার আরো বেশি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপতাল) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী ইত্তেফাককে জানান, চিকিত্সকদের কর্মস্থলে থাকা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পৃথক দুটি মনিটরিং সেল গঠন করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়েরটা মন্ত্রী নিজেই দেখবেন এবং অধিদপ্তরের সেল দেখবেন মহাপরিচালক। তিনি বলেন, চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি খুবই লজ্জাজনক। মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কর্মস্থলে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। গুটি কয়েক চিকিত্সকের কারণে পুরো চিকিত্সা ব্যবস্থার বদনাম হবে তা মেনে নেওয়া হবে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের সংকট প্রকট। সরকারি ৩৬টি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে ঢাকায় আছে মাত্র চারটি। বাকি ৩২টি মেডিক্যাল কলেজ ঢাকার বাইরে। ঢাকার বাইরের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে গড়ে ৪০ ভাগ শিক্ষকের পদ শূন্য। এরমধ্যে মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি বিভাগের ৩০ ভাগ শিক্ষকের পদ শূন্য। এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফরেনসিক মেডিসিনসহ বেসিক সাইন্সের ৪০ ভাগ শিক্ষকের পদ শূন্য। উপজেলা পর্যায়ের ৫০ ভাগ সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞের অভাবে অপারেশন বন্ধ রয়েছে। জেলা পর্যায়ের অনেক হাসপাতালে মাঝে মধ্যে অপারেশন বন্ধ থাকে। এই সংকট নিরসনে ঢাকা থেকে বদলি করা হলেও তারা কর্মস্থলে যোগদান করে ঢাকায় চলে এসেছেন, আর সেখানে যান না। আবার অনেকে একাবারেই যান না। নানা তদ্বির ও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বদলি বাতিল করে একই স্থানে অবস্থান করছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সা শিক্ষার সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। শিক্ষার্থীরা সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১০ বছরে একাধিক অনুষ্ঠানে চিকিত্সকদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়ে আসছেন। সরকারি চিকিত্সকদের কর্মক্ষেত্র থেকে যথাযথভাবে মানুষকে সেবা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, ঢাকা ছাড়ুন, কর্মস্থলে থাকুন, নয়তো চাকরি ছেড়ে দিন। তারপরও রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে এক শ্রেণির চিকিত্সক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন।

জানা গেছে, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনেক চিকিত্সক ৫ থেকে ১৬ বছর ধরে অবস্থান করছেন। অনেকে এমবিবিএস থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত হয়েছেন ঢাকায় থাকাকালে। আবার কিছু চিকিত্সকের প্রকৃত কর্মস্থল ঢাকার বাইরে হলেও তারা দীর্ঘদিন যাবত্ ওএসডি (স্বাস্থ্য অধিদফতর) ও রাজধানীর বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্তি (অ্যাটাচমেন্ট) নিয়ে ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত ভিজিলেন্স টিম অভিযান চালিয়েও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নোয়াখালী, নরসিংদী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর, গাজীপুর- এসব এলাকার শত শত বেসরকারি ক্লিনিক চলে ঢাকার ডাক্তারদের দিয়ে। উল্লিখিত এলাকায় ঢাকার চিকিত্সকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। তবে বদলি করতে গেলে তারা আবার ওই এলাকায় যেতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে কতিপয় বিএমএ ও স্বাচিপের নেতাদের ম্যানেজ করে তারা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা দ্রুত দুটি মনিটরিং সেল চালু করতে যাচ্ছি। ২৪ ঘণ্টা এই মনিটরিং সেল রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি তদারকি করবে। অনুপস্থিতদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।