নিলুফার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী। চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার সময় সে দুটি বিষয়ে ফেল করল। স্কুল থেকে নোটিশ দেওয়া হলো, পরের বছর এমন ফলাফল হলে বহিষ্কার করা হবে। মা-বাবা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন। কেন এমন হলো? তারা মেয়ের সঙ্গে কথা বললেন, স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বললেন। জানলেন, মেয়ে একটু অমনোযোগী। কেন এমন হচ্ছে, এ বিষয়ে শিক্ষকরা কিছু বলতে পারছেন না। এরপর তাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ছায়ানটের শিকড় কার্যক্রমে।
দেখা গেল, অরিগ্যামি, মাটি দিয়ে নানা জিনিস বানানো, ছবি আঁকা এসবের প্রতি মেয়ের খুব আগ্রহ। সহশিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে সে খুব আনন্দের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে স্কুলের পড়াশোনাতেও এর প্রভাব দেখা গেল। পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠেছে নিলুফার।
এ সুযোগ ছিল না তার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। শুধু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেই নয়, দেশের স্বনামধন্য স্কুলগুলোর কোনোটিতেই এসব ‘ফালতু’ বিষয়ে ক্লাস করানোর সময় নষ্ট করার সময় নেই স্কুলগুলোর। তারা আছেন বিষয়গুলোতে কীভাবে বেশি নম্বর তোলা যাবে, সেই সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টায়। শিশুদের মেধা বিকাশ, পড়ার প্রতি আগ্রহ—এসব নিয়ে ভাবার কি সময় আছে কারোর!
প্রচলিত শিক্ষাকাঠামো মানুষের মেধাকে বিকশিত করতে পারছে না। সেজন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বদলে মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব বাড়ছে। করোনা মহামারি এসে সেই ধারণাকে আরো নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফলে, সারা বিশ্বেই এখন শিক্ষা ও সৃজনশীল শিক্ষার ধারণা বদলে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক সমীক্ষা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য পর্যায়ের চাকরির খাত আগামী ২০ বছরে ৪৭ শতাংশ সংকুচিত হয়ে পড়বে। ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট জানাচ্ছে, আজকের তথ্যপ্রযুক্তির কর্মীরা যে কাজ করছে তার প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ কম্পিউটারাইজড করে ফেলা সম্ভব। সেটা যদি সম্ভব হয়, তাহলে এই খাতের কর্মীরা চাকরি হারাবে।
আরও পড়ুন: এইচএসসির ফল মোবাইলে জানতে যা করবেন
এই যদি হয় অবস্থা, তা হলে ভবিষ্যতের তরুণরা কী করবে? কী বিষয়ে পড়বে? কী ধরনের চাকরি বা ব্যবসা তারা করবে? সমীক্ষা বলছে, ভবিষ্যতে চাকরির বাজার বা অর্থপূর্ণ উত্পাদনশীল কাজে মানুষের সৃজনশীলতা, কৌতূহল, কল্পনাশক্তি এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। উদ্ভাবনমূলক অর্থনীতিতে নতুন উদ্ভাবন ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে মানবীয় আবেগ ও কল্পনাশক্তি।
ঐ সমীক্ষায় এও বলা হচ্ছে, এসব কারণেই শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে ফেলতে হবে। দুই দশক পরে যে সমস্যা বিশ্ব জুড়ে দেখা দেবে, তা মোকাবিলায় পড়াশোনার মডেল বদলানোর বিকল্প নেই। মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বদলে উদ্ভাবনমূলক সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক ও সিলিকন ভ্যালিতে ব্যবসা সম্প্রসারণে পরামর্শক জন হেগেল বলেছেন, তোমার পছন্দের ক্ষেত্র খুঁজে বের করো। খুঁজে বের করো যা তুমি সত্যিই পছন্দ করো। তুমি তোমার সেই আগ্রহের পেছনে ছোটো যতক্ষণ তুমি তোমার লক্ষ্যে না পৌঁছাচ্ছ। একবার যদি তুমি তোমার স্বপ্নের দেখা পাও, তাহলে সেই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার পথ সৃষ্টি করো। কারণ তোমার জীবনে এটাই সেই পথ যা নতুন পৃথিবীর জন্ম দিতে চলেছে।
বিশ্ব জুড়েই প্রচলিত ধারার শিক্ষাপদ্ধতিতে শিশুর বিকাশ ঘটছে না বলেই প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির বাইরেও বেশকিছু শিক্ষাধারা গড়ে উঠছে। এসব বিকল্পধারার শিক্ষাপদ্ধতি গড়ে উঠছে কিছু দর্শনের ওপর ভিত্তি করে। এ পদ্ধতি মূলধারাকে স্বীকার করে না বরং মূল ধারার অসংগতিগুলোকে তুলে ধরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপদ্ধতি এই দুই ধারার সমন্বয়ে গঠিত। গত তিন শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থাকে সমন্বয় করে গড়ে উঠেছে। এখন তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় চারটি স্তর রয়েছে। ১. স্কুল চয়েস—এ পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে পড়তে চায় তা নির্ধারণ করতে পারবে। ২. অলটারনেটিভ স্কুল—বিকল্প ধারার এ শিক্ষাপদ্ধতি, যা নতুন জীবনদর্শনের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাদের পড়ানোর ধরন, বিষয় নির্বাচন, শিক্ষার্থীকে নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, ভাবনার স্বাধীনতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। যেটা প্রথাগত শিক্ষাপদ্ধতিতে থাকে না। দেখা যাচ্ছে, এই পদ্ধতির লেখাপড়ায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার খুব কম। ৩. ব্যক্তিমালিকানাধীন ৪. হোম বেইজড এডুকেশন—এটা আমাদের দেশের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত।
এই অবস্থায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে রয়েছে? দেখা যাচ্ছে, মেধা বিকাশে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারছে না। মুখস্থবিদ্যানির্ভর পাঠ্যসূচি শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষাগ্রহণে বরং বাধার সৃষ্টি করছে। গ্রাম পর্যায়ে সরকারি স্কুলগুলোতে তো আছেই, এর বাইরে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রথাগত শিক্ষাপদ্ধতির বাইরে মেধা বিকাশের কোনো সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: আরও ছোট হচ্ছে এসএসসির সিলেবাস
এ বাস্তবতায় আমাদের শিক্ষাপদ্ধতিকে কী ঢেলে সাজানো প্রয়োজন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের শিক্ষানীতি একটি বিশ্বমানের শিক্ষানীতি। এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে আমাদের শিক্ষার মানের যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শিশুদের মেধা বিকাশে মুখস্থবিদ্যার বাইরের কিছু প্রয়োজন। আমাদের সাধারণ শিক্ষাপদ্ধতি তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, একটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির যতটা চিন্তা অভিভাবকরা করেন কিন্তু তার মেধার বিকাশ ঘটছে কি না, সে নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে তাদের ততটা দেখা যায় না। কেননা, আমাদের দেশে মুখস্থবিদ্যার অনেক দাম। কিন্তু টেকনিক্যাল ও লজিক্যাল বিদ্যার কোনো দাম নেই। তবে বাংলাদেশে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশ কার্যক্রমকে দেশব্যাপী একটি কাঠামোর ওপরে দাঁড় করাতে পেরেছে। এছাড়া ‘ফুলকি’ নামের একটি সংগঠনও মেধা মননের বিকাশে স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি ছায়ানটের ‘শিকড়’ কার্যক্রমও শিশুদের দেশের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর এক ভিন্নধর্মী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রম আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের সম্পূরক কার্যক্রম হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবে, ছায়ানটের বিকল্প ধারার শিক্ষা কার্যক্রম হচ্ছে ‘নালন্দা বিদ্যালয়’। প্রচলিত শিক্ষাকাঠামোকে অবলম্বন করেই শিশুর মেধা বিকাশের কার্যক্রমকে সমন্বয় করে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ প্রসঙ্গে ছায়ানটের সহসভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, শিকড় পরিচালনা করা হচ্ছে মূলত শিশুদের সঙ্গে সংস্কৃতি ও প্রকৃতির পরিচয় ঘটানোর লক্ষ্যে।
ইত্তেফাক/এমএএম