বিদায় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

স্বনামধন্য গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ২২ জানুয়ারি ভোরে তিনি শুধু সংগীতজগত্ থেকেই নয়, বিদায় নিলেন ইহজগত্ থেকেও। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছেন মাত্র ১৫ বছর বয়সেই, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। তিনি এই ধারাবাহিকতা আমৃত্যু লালন করে গেছেন সংগীতের মাধ্যমে। একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ছিল সংগীত— সংগীতকে ভালোবেসেছেন দেশকে ভালোবাসার ব্রত নিয়ে। আরেক অকালপ্রয়াত গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা গান ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’-এর সুর করেছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে এই গানটি এতটা প্রাণবন্ত আর হূদয়গ্রাহী হয়েছিল যে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অন্তর থেকে এখনো বেজে ওঠে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’। তাঁর হূদয়স্পর্শী সুর মানুষকে যেমন আকৃষ্ট করেছে তেমনই তিনি হয়ে উঠেছেন সংগীতের একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর তিনি নিয়মিত সংগীতচর্চা শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনশ-এর অধিক চলচ্চিত্রে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—মেঘ বিজলি বাদল, নয়নের আলো, দুই নয়নের আলো, দাঙ্গা, আনন্দ অশ্রু, প্রেমের তাজমহল, মায়ের সম্মান, অন্ধ ভালোবাসা, বিক্ষোভ, মা আমার স্বর্গ, আম্মাজান, অশান্ত আগুন, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, আঁখি মিলন, মায়ের অধিকার, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, ভালোবাসি তোমাকে প্রভৃতি।

তাঁর লেখা ও সুরারোপিত জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যিখানে, ও মাঝি নাও ছাইড়া দে, চিঠি লিখেছে বউ আমার ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে, আট আনার জীবন, পড়ে না চোখের পলক, যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, তুমি আমার এমনই একজন, কোন ডালে পাখি রে তুই বাঁধবি আবার বাসা, যদি তোমার আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই প্রভৃতি। তাঁর সুরারোপিত অনেক গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার মধ্যে উল্লেখ করা যায়—সেই রেল লাইনের ধারে, সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য, একতারা লাগে না আমার দোতরা লাগে না, আমি তোমারি প্রেম ভিখারি, ও আমার মন কান্দে ও আমার প্রাণ কান্দে, আইলো দারুণ ফাগুন রে, আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে, পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি, আম্মাজান আম্মাজান, অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে, একাত্তরের মা জননী, অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন, নদী চায় চলতে তারা চায় জ্বলতে, ও ডাক্তার আপনি যখন, সালাম বাংলাদেশ, আমি জায়গা কিনব, বুকটা আমার ভাঙা বাড়ি ইত্যাদি।

যে সব শিল্পী তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ডু্র কিশোর, সৈয়দ আবদুল হাদী, রুনা লায়লা, খালিদ হাসান মিলু, কুমার বিশ্বজিত্, সামিনা চৌধুরী, কনক চাঁপা, মনির খান, আইয়ুব বাচ্চু প্রমুখ।

বাংলা সংগীত জগেক অনেক সমৃদ্ধ করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে একুশে পদক, শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দুবার, বাচসাস পুরস্কার, শহীদ আলতাফ মাহমুদ পদক, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড প্রভৃতি। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার কারণে তাঁর ভাই মিরাজ আহমেদকে হত্যা করা হয়। সেই শোকে তিনি অনেকটা ভেঙে পড়েছিলেন। এরপর তার হার্টের ৮টি ব্লক ধরা পড়ে। তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয় এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁর চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করেন। সুস্থ হয়ে বাসায়ও গিয়েছিলেন। তবু শেষ রক্ষা হলো না। আমাদের মতো হাজারো ভক্তকে কাঁদিয়ে চিরতরে চলে গেলেন আমাদের গানের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।

n লেখক : গীতিকার ও শিশুসাহিত্যিক