মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। জীবনকে সাজাতে চায় স্বপ্নের মত করেই। কিন্তু সেজন্য প্রয়োজন হয় কঠোর পরিশ্রম, নিতে হয় দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ব্যর্থ হবার শঙ্কায় অনেকেই চ্যালেঞ্জ নেয়া থেকে পিছপা হন, ফলে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়না। যারা নানা বাঁধাবিপত্তি উপেক্ষা করেও চ্যালেঞ্জ নিতে জানেন, সফল হন তারাই। এমনই এক তরুণের নাম শাহ মোহাম্মদ জুবায়ের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী ৩৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে যোগ দিয়ে প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসেবে আত্মনিয়োগ করেছেন। এই এক বাক্যে তাঁর সাফল্যের গল্প যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবতা তত সহজ ছিলো না। নবম শ্রেণি থেকেই জুবায়ের আক্রান্ত এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে, যার ইংরেজি নাম এপিলেপ্সি। সহজ বাংলায় যাকে মৃগী রোগ বলে। এই রোগই যেন জুবায়েরের সামনে এগিয়ে চলার পথে বাঁধা সৃষ্টি করছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে তথাকথিত ভালো রেজাল্ট করায় ছোটবেলা থেকেই মেধাবী তকমাটার চাপ সামলাতে হয়েছে। এই চাপ সামলে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়াটা যেন এক কথায় ট্রয় যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সামিল ছিল। প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষার প্রচণ্ড চাপ সামলাতে না পেরে ভর্তি পরীক্ষার হলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যার ফলে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মিল না ঘটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ হয়। তবে পরের বছর আবার নব উদ্যমে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ১৩১-তম মেধাস্থান অধিকার করে সুযোগ পেলেন ফার্মেসি বিভাগে।
এদিকে একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় ভাই লন্ডন পাড়ি জমালে সংসারের পুরো দায়িত্বটাই এসে পড়ে জুবায়েরের কাঁধে। শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই পরিবারকে দেখভালের চাপ থাকায় খুব বেশি ভালো ফল করতে পারেননি। আর অনার্স পাশ করেই ঢুকে যেতে হয় বেসরকারি চাকরিতে। এসিআই, বিকন, ইনসেপ্টা, জেনারেল সহ কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করেন। এভাবে কেটে যায় চার বছর। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা জুবায়ের যেন এতে তৃপ্ত ছিলেন না। সবসময় স্বপ্ন দেখতেন, সরাসরি মানুষের সেবা করা যায়—এমন কোনো পথে হাঁটবেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেবেন। ভাবলেন, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে সরাসরি দেশ ও জাতির সেবা করার সুযোগ রয়েছে। শুরু করলেন প্রস্তুতি।
৩৭তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষার প্রথমদিনেও এপিলেপ্সি অ্যাটাক হয়েছিল জুবায়েরের। সাধারণত এমন সমস্যায় যারা ভোগেন, তাদের বেশ কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে হয় এবং তার প্রভাব থেকে যায়। তারপরও জুবায়ের হাল না ছেড়ে পরীক্ষায় অংশ নেন। বিসিএস-এর সবকটি ধাপ অতিক্রম করে সফলও হলেন। সুপারিশপ্রাপ্ত হলেন ৩৭তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারে।
শাহ মোহাম্মদ জুবায়ের বর্তমানে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত। জুবায়ের বলেন, সফল হতে হলে স্বপ্ন দেখতে হবে। শত বাঁধাতেও স্বপ্নের দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে একদিন স্বপ্ন পূরণ হবেই।
ইত্তেফাক/এসটিএম