খুলনা মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষক সংকট

দুই যুগ আগে ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়া যাত্রা শুরু করিয়াছিল খুলনা মেডিক্যাল কলেজ। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীর আসন বাড়িয়াছে তিন গুণ। বর্তমানে কলেজে ছয়টি ব্যাচে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৬১।  কিন্তু শিক্ষকের নূতন পদ সৃষ্টি হয় নাই। অন্যদিকে অনুমোদিত পদেও নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষক নাই। বর্তমানে, কলেজের ১৯টি বিষয়ে কোনো অধ্যাপক এবং ১৬টি বিভাগে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক নাই। নয়টি বিষয়ে মাত্র একজন করিয়া শিক্ষক আছেন। ফলে চিকিত্সাশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি চলিতেছে জোড়াতালি দিয়া। শিক্ষক সংকটের কারণে ব্যবহারিক, টিউটোরিয়াল ক্লাস ও পরীক্ষা সময়মতো হইতেছে না। আর, অভিজ্ঞ শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষাও পাইতেছে না। নিয়মানুযায়ী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পেশাগত পরীক্ষায় পরীক্ষক হইতে পারিবেন; কিন্তু এই মেডিক্যাল কলেজের ১৯টি বিষয়ে কোনো অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক নাই। সহকারী অধ্যাপকের ১৩টি এবং প্রভাষকের ৫টি করিয়া পদও শূন্য রহিয়াছে। অথচ শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলা হইয়াছে।

খুলনার তুলনায় অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার উন্নততর বন্দোবস্ত আছে এমনটিও বলা যাইবে না। একদিকে নূতন সরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাইতেছে না; অন্যদিকে, অবকাঠামো, শিক্ষা সরঞ্জাম ও জনবলের নিশ্চয়তা ছাড়াই নূতন নূতন মেডিক্যাল কলেজ খোলা হইয়াছে। প্রতিটি জেলায় একটি করিয়া সরকারি মেডিক্যাল কলেজ খোলার পরিকল্পনাও আছে সরকারের। দেশে ১০৫টি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে সরকারি ৩৬টি, আর বেসরকারি ৬৯টি। এসকল কলেজে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫২ হাজারের কিছু বেশি; শিক্ষক আছেন ৯ হাজার ৪০৩ জন। অথচ, দরকার অন্তত ২৫ হাজার ৩০০ জন। অর্থাত্ ৬৩ শতাংশ শিক্ষকের ঘাটতি লইয়াই মেডিক্যাল শিক্ষা দিয়া যাইতেছে কলেজগুলি। মৌলিক বিষয়ের শিক্ষক সংকট থাকায় শিক্ষকেরা বিভিন্ন কলেজে ভাগ হইয়া যাইতেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের কারণেই নিম্নমানের চিকিত্সক তৈরি হইতেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অনুসন্ধান এবং পর্যালোচনাতেও নূতন সরকারি কলেজগুলির দুর্বলতা ও বেসরকারি কলেজগুলির অনিয়ম ধরা পড়িয়াছে।

একজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী কলেজে ঢুকিয়াই যদি দেখেন ক্লাস হইতেছে না, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নাই, তখন তাহার আগ্রহ অনেক কমিয়া যায়। আর মৌলিক বিষয়ে দুর্বল হওয়ায় অন্য বিষয়গুলিও শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে আয়ত্ত করিতে পারেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) মানসম্পন্ন মেডিক্যাল শিক্ষার জন্য কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক থাকিতে হইবে, তাহার একটি নির্দেশিকা তৈরি করিয়াছে ২০০৯ সালে। গবেষণায় দেখা গিয়াছে যে, দুর্বল অবকাঠামো ও শিক্ষকস্বল্পতার কারণে নিম্নমানের চিকিত্সক তৈরি হইতেছে। দেশে চিকিত্সাসেবার মান নিয়া অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমান অবস্থা চলিতে থাকিলে নিম্নমানের সেবা স্থায়ী রূপ পাইবে। অথচ, সরকার শিক্ষা বিষয়ে অনেক অগ্রগতি দেখাইয়াছে। সর্বোপরি, চিকিত্সাবিদ্যা চর্চার পথ সুগম করিয়া সর্বসাধারণের জন্য সুলভে সুচিকিত্সা নিশ্চিত করিতেও সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উদ্যোগী ভূমিকা পালন করিলে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ অচিরেই এই শিক্ষক সংকট কাটাইয়া উঠিতে পারিবে। অন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।