হোটেলগুলিকে দিতে হইবে কঠোর বার্তা

কুকুরের লেজ নাকি সোজা করা যায় না। রাজধানীর কয়েকটি খাবারের হোটেল আমাদের নূতন করিয়া যেন বহুল প্রচলিত সেই কথাটিই স্মরণ করাইয়া দিল! নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পচা-বাসি খাবার বিক্রির দায়ে হোটেল-রেস্টুরেন্টকে জরিমানার ঘটনা এদেশে নূতন নহে। তবে গত সোমবারের ঘটনাটি অন্যরকম শুধু নহে, অত্যন্ত লজ্জাকরও বটে। অবিশ্বাস্য হইলেও সত্য যে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ‘এ গ্রেড’ রেস্টুরেন্টের স্বীকৃতি পাওয়ার পরদিনই পচা ও বাসি খাবার বিক্রির দায়ে লক্ষ টাকা জরিমানা গুনিতে হইয়াছে রাজধানীর তিনটি খাবারের হোটেলকে। হোটেলগুলি হইল— সেগুনবাগিচার ভোঁজ বাংলার স্বাদ, বাগিচা রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড পার্টি সেন্টার এবং ইনজয় রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ফাস্ট ফুড। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এই দণ্ড প্রদান করে। মাত্র একদিন আগে ঢাকার ৫৭টি রেস্টুরেন্টকে মান বিবেচনায় ‘এ-প্লাস’ (উত্তম) ও ‘এ’ (ভালো) গ্রেডের স্বীকৃতি দিয়াছিল বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তন্মধ্যে ১৮টি ‘এ-প্লাস’ এবং ৩৯টি ‘এ’ গ্রেড পায়। জরিমানা দণ্ডপ্রাপ্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানই ছিল ‘এ’ গ্রেডভুক্ত। মুখ্যত জনস্বাস্থ্যের বিবেচনায় খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মতো গৃহীত রেটিং এর এই উদ্যোগটিকে আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে স্বাগত জানাইয়াছিলাম। ইহার যৌক্তিক কারণও ছিল। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কারণটি ছিল, দেশে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় একদিকে যেমন যথেচ্ছভাবে পচা-বাসি ও নিম্নমানের খাবার বিক্রি হইতেছিল, অন্যদিকে তেমনি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি প্রতারিত হইতেছিলেন ভোক্তাসাধারণও। আমরা আশা করিয়াছিলাম, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি বদলাইবে। ইতিবাচক পরিবর্তন আসিবে হোটেল-রেস্তোরাঁর সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিবেশিত খাবারের মানে। কিন্তু সূচনালগ্নেই আমাদের সেই প্রত্যাশা যে মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছে তাহার জন্য আমরা যতটা না বিব্রত, ততোধিক উদ্বিগ্ন উদ্যোগটির কার্যকারিতা বিষয়ে। 

সন্দেহ নাই যে, যাহা ঘটিয়াছে তাহাতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগটি কিছুটা হইলেও প্রশ্নবিদ্ধ হইয়াছে। কিন্তু এদেশের বাস্তবতা সম্পর্কে যাহাদের যিকঞ্চিত্ ধারণা আছে তাহারা নিশ্চয় মুদ্রার অপরপিঠটি সম্পর্কেও সম্যকভাবে অবহিত আছেন। পরিদর্শনকালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যে ইতিবাচক চিত্র প্রত্যক্ষ করিয়াছেন তাহা নহে, বরং একদিনের ব্যবধানে ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ যেই ভয়াবহ চিত্র দেখিয়াছেন— তাহাই অভিযুক্ত হোটেলগুলির আসল চিত্র হইলে আমরা মোটেও অবাক হইব না। এই যে অসাধু মানসিকতা তাহা যে দিনদিন মহামারী রূপ পরিগ্রহ করিতেছে সে কথাই-বা আমরা অস্বীকার করিব কীভাবে! এই রুগ্ন মানসিকতা কীভাবে বদলাইবে কিংবা আদৌ বদলাইবে কিনা তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা কঠিন। তবে বদলাইতে হইবে অবশ্যই। অন্যথায় আমরা যে উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখিতেছি তাহা অধরাই থাকিয়া যাইবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যেই উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছেন তাহা হইতে কোনো অবস্থাতেই পিছাইয়া আসা যাইবে না, বরং উদ্যোগটিকে আরও কীভাবে কার্যকর ও নিখুঁত করা যায়, সেদিকেই অধিক নজর দিতে হইবে। সংশোধনের সুযোগ আছে, থাকিবে। কিন্তু সকলেরই মনে রাখা আবশ্যক যে, কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে। যাহারা কথা শুনিবে না তাহাদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি দিতে হইবে কঠোর বার্তা।