সড়কে মৃত্যু আর কত?

প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ওলটালে দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদ। প্রতিদিনের সংবাদপত্রে সড়ক দুর্ঘটনা এখন একটি স্বাভাবিক খবর। অন্য অনেকের কাছে এটি স্বাভাবিক সংবাদ হলেও প্রিয়জনদের কাছে তা মহাদুঃসংবাদ হয়ে আসে, যে সংবাদের মূল্য শুধু প্রিয়জনেরাই বুঝতে পারে, অন্য কেউ তা বুঝতে অক্ষম। দুঃখের বিষয়, এমন শোকের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছেই। কোনোভাবেই কমছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল। মৃত্যুর মিছিলের সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে শোকের মিছিলও। এখানে আরো একটি তথ্য সবার মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। গত ৬ জানুয়ারি নিরাপদ সড়ক চাইয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৪ হাজার ৯৬৯ জন। এছাড়া আহত হয়েছে ৫ হাজার ৮৫ জন। এটা গত বছরের হিসাব। নতুন বছর শুরু হতে না হতে সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, দেশে কেন বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা? কেন কমানো সম্ভব হচ্ছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল? এর উত্তর খুঁজতে অতিতে গবেষণা হয়েছে এবং বর্তমানেও ব্যাপক হারে হচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ যেন কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু কেন? দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো চালকদের অসতর্কতা ও দক্ষতার অভাব।

দীর্ঘদিন ধরেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইনের দাবি উঠে আসছিল। সেই দাবির আলোকে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এই আইন কার্যকরের পরও এর সুফল আমরা পাচ্ছি না। আমাদের দেশের বাস্তবতায় নিত্যদিনের যাত্রায় মানুষের নির্ভরতা সড়কপথেই বেশি। দেশের প্রধান যোগাযোগমাধ্যমও সড়কপথ। কিন্তু সেই সড়কপথ অনিরাপদ। যাত্রী পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রে সড়কপথের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। তাই সড়কপথ সবচেয়ে বেশি শৃঙ্খলিত ও নিরাপদ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তব চিত্র যেন উলটো। আমাদের সড়কপথে নিরাপত্তা নেই, নেই শৃঙ্খলা। এর প্রভাবে সড়কে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনা। নতুন আইন করার পরও সড়কে দুর্ঘটনা না কমার বিষয়টি দুঃখজনক। পাশাপাশি হতাশারও। কারণ এই আইনের পরও বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিন সড়কে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে এবং এর সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, আমাদের দেশের বাস্তবতায় শুধু আইন কার্যকর করলেই হবে না। এর পাশাপাশি কিছু উদ্যোগও নিতে হবে। কারণ আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ সড়কে চলাচলের পরিবেশ, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের অসতর্কতা, সড়ক নির্মাণে প্রকৌশলগত ত্রুটি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনীহা, চালকদের মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালানো, যানবাহন ও সড়ক ব্যবহারকারী তথা চালক, যাত্রী ও পথচারীসহ সবার অসচতেনতার বিষয়গুলো প্রধান। এছাড়া দেখা যায় দেশের সব মহানগরে যত পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, তার দ্বিগুণের বেশি মারা যান শুধু ঢাকা মহানগরে। এর পেছনেও রয়েছে অনেকগুলো কারণ। প্রধান কারণ ঢাকায় মানুষ ও যানবাহন দুটোর সংখ্যাই বেশি। পাশাপাশি রয়েছে সব স্থানে জেব্রা ক্রসিং না থাকা, ফুটপাত না থাকা কিংবা অবৈধ দখলে চলে যাওয়া, স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং পথচারী পারাপারে অব্যবস্থাপনার ত্রুটি সড়ক দুর্ঘটনার কারণ।

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতি কেমন? শুধু কি প্রিয়জন হারানোর একটি সংখ্যা? না, পরোক্ষ দৃষ্টিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতি ব্যাপক, যা অনেকে সেভাবে ভেবে দেখেন না। বাস্তবতা হলো, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে দেশজ উত্পাদনে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই শিশু, তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। বিশেষ করে তরুণ ও কর্মক্ষম এই দুই শ্রেণিকে দেশের ভবিষ্যত্ ও অর্থনীতির মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগের বেশি মানুষই কর্মক্ষম, যাদের বয়স ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। নিহতের পরিবার এসব কর্মক্ষম মানুষকে হারিয়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের মৃত্যুর কারণে পুরো পরিবারে দেখা দেয় একধরনের অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি শুধু পরিবার নয়, তাদের হারিয়ে দেশও হয় ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ কর্মক্ষম জনগণ যেমন পরিবারের জন্য সম্পদ, তেমনি দেশের জন্যও। কিন্তু দিনে দিনে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণে দেশজ উত্পাদনে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

প্রশ্ন হলো, এ থেকে উত্তরণের কি কোনো উপায় নেই? অবশ্যই এ থেকে উত্তরণ সম্ভব। এক্ষেত্রে সবার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ। আইনের কঠোর প্রয়োগও জরুরি। তবেই সড়কে আর কোনো প্রিয়জনকে আমরা হারাব না। প্রিয়জন হারানোর শোকও কাউকে সইতে হবে না। আর দেশজ উত্পাদনে নেতিবাচক প্রভাবও পড়বে না।

n লেখক :সাংবাদিক