পলিথিনে মোড়ানো তাঁবুতে হযরত আলীর মানবেতর জীবন

ধরলার পাড়ে খোলা আকাশের নিচে পলিথিন দিয়ে মোড়ানো তাবুতে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন ৬৭ বছরের এক অসহায় বৃদ্ধ। উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দুরে শেখ হাসিনা ধরলার সেতুর উত্তর পার্শ্বে ধরলা নদীর বাঁধের উপরে নুরনবী মিয়ার জমিতে থাকেন তিনি। বুধবার সকালে কোনো রকমে বৃদ্ধ হযরত আলী (৬৭) পলিথিনের মোড়ানো তাঁবুর ভেতরে সকালের খাবার রান্না করতে দেখা যায়। 

হযরত আলী বলেন, বউ-বাচ্চা সবেই ছিলো। এখন পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই। মুই (আমি) বড় একা বাহে (বাবা)! দেখতেছেন মুই (আমি) নিজেই রান্না করছং (করছি) বাহে (বাবা)। জমি-জমাও নেই। ধরলার পাড়ত মানুষের জমিতেই পরিয়া আছনুং (ছিলাম)। কায়ো (কেউ) মোর খোঁজ নেয় নাই (রাখেনি)। সরকার অনেক মানুষকে জমি দিয়া প্যাঁকা ঘর তুলে দিচ্ছে। কিন্তু মোর কপালে জোঁটেনি প্যাঁকা ঘর বাহে! হযরত আলী এভাবেই অতি দুঃখের সহিত কান্না জড়িত কন্ঠে আঞ্চলিক ভাষায় কথা গুলো বলেন। হযরত আলী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের সোনাইকাজী গ্রামের মৃত ইউনুফ আলীর ছেলে। 

জানা যায়, বয়স বেশি হওয়ায় এখন আগের মতোই কাজ করতে পারে না। কোনোরকম জীবন বাঁচার তাগিতেই মানুষের বাড়িতে ধার-দেনা করে দু-মুঠো খাবার জোটে। কোনো কোনো দিন না খেয়েই রাত যাপন করতে হয়েছে। কখনো কখনো প্রতিবেশীরা খাবার দিতো। এভাবেই চলে তার জীবন-জীবিকা। এক সময় স্ত্রী-সন্তান থাকলেও এখন কেউ নেই তার পাশে। অনেক কষ্টে ১০ হাত একটা টিনের ঘর তুললেও অভাবের তারনায় সেই পুরানো ঘরটি বিক্রি করেছেন হযরত আলী। তিনি এখন যাযাবরদের মতোই তিন থেকে চার মাস ধরে সোনাইকাজী এলাকার ধরলার পাড়ে নুরনবী মিয়ার জমিতে এক টুকরা পলিথিন দিয়ে তাবুতে বসবাস করছেন তিনি। চারদিকে খুঁটি বেঁধে সেখানেই টানিয়েছেন প্লাস্টিক ও ছেড়া কাপড়। এখন চৌকিতেই পেতেছেন সংসার। অসুস্থ হযরত আলী এভাবেই লড়াই-সংগ্রাম করেই চলছে। 

তার দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। এক মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়েটা থাকেন নানির বাড়িতে। ২০১৭ সালে তার স্ত্রী অভিমান করে ছোট ছেলেসহ বড় ছেলের সংসারে থাকেন। দুই ছেলেই এখন নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টে কাজ করেন। ছেলের সংসার থাকা স্ত্রী জয়নব বেগম ২০১৮ সালের ১০ জুলাই স্বামী হযরত আলীর কাছে তালাকের নোটিশ পাঠান। সে থেকেই হযরত আলী স্ত্রী-সন্তান ছাড়াই নিঃসঙ্গ জীবন কাঁটান। চোখের সামনে সন্তান থাকার পরেও পারে না বাবা ডাক শুনতে। গত রবিবার বৃদ্ধ ভাতার ১ হাজার ৫শ টাকা পেয়ে স্বস্তি পেলেও মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় চরম বিপাকে আছেন হযরত আলী। 

স্থানীয় হারুন মিয়া ও এরশাদুল হক জানান, অসহায় মানুষটির দুর্দশার কথা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানলেও তারা তাদের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেননি। বৃদ্ধ বয়সে আগের মতো কাজ করতে পারেন না। স্ত্রী-সন্তান থেকেও নেই। নিরুপায় হয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন। 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.তৌহিদুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীনদের চুড়ান্ত তালিকা করে গৃহনির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। আমরা তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছি। যদি সুযোগ থাকে তাহলে তার আবেদনের ভিত্তিতে চলমান বরাদ্দের মাধ্যমে তাকে গৃহনির্মাণ করে দেওয়া হবে। আর যদি সুযোগ না থাকে তাহলে সামনের বরাদ্দে হযরত আলীকে এই প্রকল্পে তালিকাভূক্ত করে জমিসহ একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে। 

ইত্তেফাক/কেকে