সেয়ানে সেয়ানে লড়াই

যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার দুই রাষ্ট্রপ্রধানের ফের সাক্ষাত্ হইবার কথা রহিয়াছে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে। তবে সম্প্রতি পুনরায় শর্তভঙ্গের অভিযোগ উঠিয়াছে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে। এই দুইটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইতিপূর্বে উভয় দেশ উভয় দেশকে পিষিয়া মারিতে চাহিয়াছে, মানচিত্র হইতে মুছিয়া দেওয়ার হুমকি দিয়াছে। এই সকল হুমকি-ধামকি সত্ত্বেও গত বত্সর জুনে সিঙ্গাপুরে ঐতিহাসিক বৈঠকে সামিল হন উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রামপ। সেইখানে এক ধরনের ধোঁয়াটে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন কিম, যেইখানে বলা হইয়াছিল পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পথে পূর্ণ সহযোগিতা করিবে তাহার দেশ। ইহার বিপরীতে নিরাপত্তার গ্যারান্টি চাহিয়াছিল পিয়ংইয়ং। কিন্তু বাস্তবে নিরস্ত্রীকরণের কাজে কতদূর আগাইয়াছে উত্তর কোরিয়া তাহা লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রকাশ করা রিপোর্টে গত সোমবার দাবি করা হইয়াছে যে, ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রক বেসের কথা লুকাইয়া গিয়াছে উত্তর কোরিয়া এবং তাহার সদর দপ্তরটিকেও চিহ্নিত করিয়া ফেলিয়াছে তাহারা। ইহার অর্থ হইল—প্রতিশ্রুতিমাফিক মোটেও অস্ত্র পরিত্যাগের কাজ করিতেছে না পিয়ংইয়ং। বরং গোপনে চালাইয়া যাইতেছে অস্ত্র উত্পাদনের কাজ! ওই রিপোর্টে ইহাও দাবি করা হইয়াছে যে, দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল হইতে ১৬০ মাইল দূরে রহিয়াছে গোপন সদর দপ্তরটি—যেইখানে মিডিয়াম-রেঞ্জের ভূমি হইতে ভূমিতে নিক্ষেপের ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার রহিয়াছে।

প্রতিবেদনটির দাবির সত্যতা থাকিলে বলিতে হয় যে, ক্ষেপণাস্ত্রটি দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান এমনকী  যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ামেও অভিঘাত হানিতে সক্ষম। অর্থাত্ গত জুনের বৈঠকের পরও উত্তর কোরিয়ার দিক হইতে আমেরিকা যে সুরক্ষিত বলিয়া দাবি করা হইয়াছিল, তাহা সঠিক নহে। এমনকী গত ২৭ ডিসেম্বর উপগ্রহচিত্র হইতে ওই চত্বরে আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারের প্রবেশপথ-শেল্টারও নজরে আসিয়াছে বলিয়া জানা যায়। সিএসআইএস জানাইতেছে, ওই ২০টি বেসকে কখনোই প্রকাশ্যে ঘোষণা করে নাই উত্তর কোরিয়া। কোনো কোনো বিশ্লেষক দাবি করিতেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে উত্তর কোরিয়া সেইসকল বিষয় লইয়া দরকষাকষি করিবেন না যাহা তাহারা প্রকাশ্যেই আনেন নাই। দৃশ্যত ইহা যেন এক ধরনের খেলা, বাংলায় যাহাকে বলা যায়—সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। কিছুদিন পূর্বেই জানা গিয়াছে, ফেব্রুয়ারির শেষার্ধে ভিয়েতনামে পুনরায় সাক্ষাত্ করিবেন ট্রাম্প এবং কিম। তাহার পূর্বে এই ধরনের প্রতিবেদন কতখানি সত্য আর কতখানি উদ্দেশ্য প্রণোদিত, তাহা স্পষ্ট নহে। হোয়াইট হাউজ কোনো মন্তব্য না করিলেও মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের মুখপাত্র কিম জুন-রাক এক বিবৃতিতে বলিয়াছেন যে, আমেরিকার সহযোগিতায় ওই বেসটিকে তাহারা নিজেদের স্বার্থেই দীর্ঘদিন ধরিয়া নজরে রাখিতেছে।

উত্তর কোরিয়ার শক্তি ও সমস্যা কেবল তাহার নিজস্ব নহে—উহা ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণ। এই সমীকরণের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি ভৌগোলিক হিসাবনিকাশে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থানে রহিয়াছে। ফলে ইহা এখন বহুমেরুকরণ বিশ্বে পরাশক্তিদের ছায়াশক্তির এক ধরনের সেয়ানে সেয়ানে লড়াই হিসাবে আবির্ভূত হইতেছে। সুতরাং, ইহার সমাধান সহজ নহে।