আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি, কাশ্মির থেকে কন্যাকুমারি, দ্বারকা থেকে ডিগয়ে— তামাম এই ভারতবর্ষের ৯০ কোটিরও বেশি ভোটার স্থির করবেন তারা কি চান গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা না-রাম মন্দির। ৫ বছর আগে এ দেশের ১৩০ কোটি মানুষকে শোনানো হয়েছিল— “অচ্ছে দিন”। ৫ বছরে মানুষ কী দেখল, তারা কী পেল? এলো কঠিনতম দুর্দিন, ধর্মে-ধর্মে বিচ্ছেদ। এই গণতন্ত্রকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ইন্দিরা গান্ধীর নাতি রাহুল গান্ধী। আর যাকে শুধু হিন্দি বলয়ে নয় ভারতবর্ষের কোনে কোনে আনার জন্য জনগণ দাবি জানিয়ে এসেছিল-ইন্দিরা গান্ধীর নাতনি প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। এই লেখার কয়েক ঘণ্টা আগে দিল্লির ২৪নং আকবর রোড কংগ্রেসের সদর দপ্তর থেকে ঘোষণার পরেই সারা দেশ উল্লাসে ফেটে পড়েছে।
কে এই প্রিয়াঙ্কা গান্ধী? তিনি হলেন ইন্দিরা গান্ধীর নাতনি এবং রাজীব গান্ধীর তনয়া। বেশিদিনের কথা নয়, ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর তিনি যখন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন তখন তিনি শেষ কথা বলেছিলেন “ধাওয়ান, ধাওয়ান তুমি রাহুল-প্রিয়াঙ্কাকে বাঁচাও”। বাবা রাজীব গান্ধী সেই সময় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের খড়গপুরে, খবর পেয়েই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু সামরিক বাহিনীকে ফোন করে তাদের দুটো হেলিকপ্টার দিয়ে তাদের খড়গপুর থেকে কলকাতা বিমানবন্দরে নিয়ে আসেন। ইতোমধ্যে কলকাতাসহ সারাবিশ্বে খবর ছড়িয়ে যায়—ইন্দিরা গান্ধী আর নেই। আমিও তখন বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলাম। রাজীব গান্ধী যে বিশেষ বিমানটিতে দিল্লি যাচ্ছিলেন তার পাইলটও ছিলেন রাজীবের একজন ব্যাচমেট। রাজীব তাকে দেখেই অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তুমি একবার ককপিটে গিয়ে আমার বাড়িতে ফোন করে দেখ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা কেমন আছে— আদৌ বেঁচে আছে কি-না। ঐ বিমানেই ছিলেন লোকসভার সাবেক স্পিকার বলরাম জাকব। ছিলেন ভারতের লোকসভার সচিবও। সাবেক রেলমন্ত্রী বরকত গণি খান চৌধুরীও ছিলেন। জাকব বরকত এবং প্রণব মুখার্জী রাজীবকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী করা যায় কিনা সে বিষয়ে আইনগত দিকটি দেখতে বলেন। বরকত গণি খান ও জাকব তাদের জানান, ভারতবর্ষের যেকোনো নাগরিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন, তবে ৭ দিনের মধ্যে তার দল তাকে যে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করলেন তা রাষ্ট্রপতিকে জানাতে হবে। দিল্লির পালাম বিমানবন্দর থেকে সোজা চলে গেলেন রাষ্ট্রপতি ভবনে। রাষ্ট্রপতি তখন পাঞ্জাবের জ্ঞানী জৈলসিং। তার কাছে গিয়ে রাজীব গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য জানালেন এবং এও বললেন, ৭ দিনের মধ্যে তারা দলের অনুমতিপত্র তাকে দেবেন। জৈলসিং আর সময় নষ্ট না করে এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান এবং রাজীব গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন। এবং ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভার যেসব মন্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাদের সবাইকেই তিনি শপথ বাক্য পাঠ করান। রাজীব গান্ধী এক মাসের মধ্যে লোকসভা ভেঙে দিয়ে পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেন। ৫৪৪ আসন বিশিষ্ট লোকসভায় ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর দল ৪১৫টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল।
উক্ত ইতিহাসটি আমার মতে, বাংলাদেশের পাঠকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে গান্ধী পরিবারের যোগসূত্র সেই ১৯৭১ সাল থেকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর পেয়ে ইন্দিরা গান্ধী দিশেহারা হয়ে পড়েন। স্থির করেন সফররত মুজিবের দুই কন্যা, জামাই ও নাতি-নাতনিদের দিল্লিতে নিয়ে আসবেন। তিনি আরও স্থির করেন কোনো বাঙালি মন্ত্রীকে জার্মানিতে পাঠিয়ে দিল্লি নিয়ে এসে তার কাছে রাখবেন। তিনি তখন খোঁজ করছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ও তার মন্ত্রিসভার অন্যতম মন্ত্রী দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের। কিন্তু সেদিন ছিল ১৫ আগস্ট, তাই ছুটি ছিল। তখন সেখানে উপস্থিত ইন্দিরা গান্ধীর একান্ত সচিব আর. কে ধাওয়ান তাকে মনে করিয়ে দিলেন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রকের ডেপুটি মিনিস্টার প্রণব মুখোপাধ্যায় দিল্লিতে আছেন। তখন প্রণববাবু ২নং সফদরজং রোডে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আবাসনে এলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে নির্দেশ দিয়ে বললেন—তুমি এখনি আমার ১নং এয়ারফোর্সের বিমানটি নিয়ে জার্মানীর রাজধানী বন-এ চলে যাও, বন ছিল তখন জার্মানির রাজধানী। মুজিবের মেয়ে-জামাই ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে করে নিয়ে আসবে—এদিকে যা ব্যবস্থা করার আমি তা করছি। এই ঘটনা আমার শোনা সাবেক ভারতের বিদেশ সচিব এবং ‘র’-এর প্রধান আর এন কাউরের কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রণববাবু জার্মানি থেকে একদিন পর বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার স্বামী ওয়াজেদ, পুত্র-কন্যা, বোন রেহেনা ও তার স্বামীকে নিয়ে দিল্লিতে ফিরলেন। তারা ফেরার আগেই পান্ডরা রোডে তাদের বাসস্থানের সব ব্যবস্থা ইন্দিরা গান্ধী করে রেখেছিলেন। রাহুল-প্রিয়াঙ্কা তখন ছোট হলেও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্নেহভাজন হয়ে উঠেছিলেন। ইন্ধিরার দুই পুত্রবধূ সনিয়া ও মানেকার সঙ্গেও শেখ হাসিনার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই ইতিহাসটা লেখা খুবই প্রয়োজন ও সময়োপযোগী। কারণ গত ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় আমি যখন ঢাকায় যাই তখন এর ঠিক উল্টো কথা আমার কানে এসেছে এবং কিছু কিছু সাংবাদিকও আমাকে নানা রকম প্রশ্ন করেছিলেন। আমি সেই বিতর্কে না গিয়ে সত্যি ঘটনাটা পাঠকের সামনে তুলে ধরছি। এই কারণে যে, ইতিহাসকে বিকৃত করা ঠিক নয়।
এবার প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি করে নির্বাচনের আগে রাহুল গান্ধী এক মোক্ষম ঐতিহাসিক চাল দিলেন। এক ঢিলে তিনি দুই পাখি মারলেন। উত্তর প্রদেশে লোকসভা থেকে ৮০টি আসন আছে। মাত্র দুটি আসন কংগ্রেসকে ছেড়ে মায়াবতীর বহুজন সমাজপার্টি এবং সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব ৩৮, ৩৮টি করে মোট ৭৬টি আসন ভাগ করে নেন। সেদিনই রাহুল গান্ধীর দল সর্বভারতীয় কংগ্রেস ঘোষণা করে দেয় তারা এককভাবে ৮০টি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। হিন্দিবলয়ের উত্তর প্রদেশের লোকসভা নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। আর বাকি পশ্চিম বিহারের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মধ্য প্রদেশের ডাকসাইটে নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিদ্ধিয়াকে, ২০০৯ সালে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস এককভাবে লড়ে ৮০টির মধ্যে ২২টি আসন পেয়েছিল। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এর আগে ২০০৪ সাল থেকে ওয়ার রুমের চার্জে ছিলেন, ২০০৪ সালে তিনি অমেথিতে রাহুল ও সনিয়ার প্রচার সামলেছেন। ২০১৭ সালে গুজরাট ও উত্তর প্রদেশের ভোটের ওয়াররুমের ভার অনেকটাই তার কাঁধে ছিল। রাহুলের সভাপতি হবার সময়ও অনুষ্ঠান কী হবে এবং কেমন হবে তা প্রিয়াঙ্কাই ঠিক করেন। ২০১৮-তে কর্ণাটক ও পরে আরও ৫ রাজ্যের ভোটে কৌশল তৈরিতে সাহায্য করেন। এ ছাড়াও তিন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী বাছাইয়েও তিনি রাহুলকে সাহায্য করেন।
প্রিয়াঙ্কার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ ঘোষণা করে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেন— “আমার বোন যোগ্য ও কঠোর পরিশ্রমী, শুধু ২ মাসের জন্য ওকে উত্তর প্রদেশে পাঠাচ্ছি না। গরীব, যুবক, বে-রোজগারী কৃষকদের জন্য লড়াই করে প্রিয়াঙ্কা আমাদের বিচারধারা প্রসারিত করবে।” প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর রাজনীতিতে যোগদানের ফলে বিজেপি তথা গেরুয়া বাহিনীর কপালে ভাঁজ পড়েছে। অমেথিতে রাহুল গান্ধী সহাস্যে স্পষ্টভাবে বলেছেন— ‘বিজেপি একটু ভয় পেয়েছে, আমরা কোনোভাবেই ব্যাকফুটে খেলব না, গুজরাটেও খেলিনি, উত্তরপ্রদেশেও নয়। বেজিপে যে ভয় পেয়েছে তা সত্য। কারণ প্রিয়াঙ্কার অভিষেকের পরই মোদী ও তার মন্ত্রীরা সমালোচনায় নেমে পড়েছেন। এ ব্যাপারে মোদী মহারাষ্ট্রের বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে ভিডিও মারফত কথা বলেছেন। এও বলেছেন যে, শরদ পাওয়ার কংগ্রেসের সভাপতি হতে চেয়েছিলেন বলে তাকে কংগ্রেস ছাড়তে হয়েছিল।
প্রিয়াঙ্কার নাম না নিয়েও তার অভিষেক যে ছাপ ফেলেছে তা বুঝিয়ে দিলেন। তিনি আরও বলেন যে, তাদের দলের কোনো পরিবার বা এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই। দলই হলো এখানে পরিবার। মন্ত্রিসভার গৃহীত সিদ্ধান্তের কথা জানাতে এসে রবিশঙ্কর প্রসাদ খোঁচা দিয়ে বলেন, শুধু উত্তরপ্রদেশের ছোট প্রান্তের দায়িত্ব না দিয়ে প্রিয়াঙ্কাকে আরও বড় দায়িত্ব দিতে পারতেন। স্মৃতি ইরানীও মন্তব্য করেন যে, কংগ্রেস আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলো রাহুল গান্ধী ব্যর্থ। এর উত্তরে অবশ্য কংগ্রেসের রাজীব শুক্লের কটাক্ষ—প্রিয়াঙ্কার নামেই যদি বিজেপির এত আতঙ্ক তবে তিনি কাজ করতে শুরু করলে বিজেপির কী হবে?
কংগ্রেস দল ’৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে যতদিন তারা ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ১৯৭২ সালের ১৮ই মার্চ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্ধিরা গান্ধীর সঙ্গে যে ১২ দফা চুক্তি হয়, তাতেও স্পষ্টভাবে বলা আছে—পারস্পরিক স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক সংহতির প্রতি উভয়ের শ্রদ্ধা ও প্রতিশ্রুতি জানিয়ে দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।
n লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক