হরতাল ডাকা নিয়ে রাজনীতিকদের নতুন করে ভাবতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলনেরও পরিবর্তন জরুরি। সরকারকে বিরোধী দলকে রাজনীতির সুযোগ দিতে হবে, মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে। কারণ সরকারকে বুঝতে হবে, গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকতে হয়। সেইসঙ্গে, আধুনিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দেশের উন্নয়নে এটা জরুরি। শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। কেননা, ষাটের দশকে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যেভাবে মানুষ হরতালে সমর্তন দিয়েছে, সাম্প্রতিককালে জনগণ হরতালের প্রতি সমর্থন দিচ্ছে না। গতকাল সাংবাদিক গবেষক অজয় দাশগুপ্ত রচিত ‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গতকাল শুক্রবার বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। বইটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. হারুন-অর-রশিদ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হোসেন চৌধুরী, দৈনিক সমকাল- এর প্রকাশক এ কে আজাদ, ডিআইজি শেখ মোঃ মারুফ হাসান প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বইটির লেখক অজয় দাশগুপ্ত। ১৯৪৭ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত সময়কালের জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় প্রতিটি হরতালের বিবরণ এবং এ সুদীর্ঘ সময়ে এ ভূখণ্ডের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক ঘটনা জানা যাবে বইটিতে। সেইসঙ্গে বইটিতে যুক্ত করা হয়েছে সেই সময়ের প্রেক্ষিতে হরতালের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন।
জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ভিন্ন ভিন্ন সংবাদপত্র ভিন্নভাবে হরতালের তথ্য উপস্থাপন করে থাকে। কেউ বলে হরতাল সফল হয়েছে, কোনো পত্রিকা বলে হরতাল সফল হয়নি। যার মতাদর্শের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে পত্রিকাগুলো। বুঝতে হবে, সবসময় সব কাগজ সত্য কথা বলে না। তাই, সংবাদপত্রের তথ্য নেওয়ার সময় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, গ্রন্থটি তথ্যের আকর গ্রন্থ। যারা বাংলাদেশের ইতিহাস রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে লিখবেন তাদের জন্য খুব প্রয়োজনীয় একটি বই। দুষ্প্রাপ্য পত্রিকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
রওনক জাহান বলেন, ষাটের দশকে হরতাল কম হতো কিন্তু তা সফল হতো কারণ জনসমর্থন ছিল ব্যাপক। পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর হরতাল কর্মসূচি বাড়তে থাকে। কিন্তু জনসমর্থন কমে আসতে দেখা গেছে। এই জনসমর্থন কেন কমে আসছে, জনপ্রিয়তা কেন হারাচ্ছে, ইস্যুতে মানুষের সমর্থনের অভাব নাকি জানমালের ক্ষতিসাধন হচ্ছে সেজন্য- এসব নিয়েও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
হারুন-অর-রশিদ বলেন, সমাজে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ষাটের দশকে যে হরতাল মানুষ সমর্থন করেছে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যেভাবে হরতাল জনসমর্থন পেয়েছে — এখন তা মানুষ গ্রহণ করে না। তাই রাজনীতিবিদদের হরতালের পথে না গিয়ে রাজনীতি নিয়ে নতুনভাবে কথা বলতে হবে।
কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, হরতাল রাজনীতির একটা অস্ত্র। যা জনমানসের প্রতিবাদের প্রকাশ। হরতাল কখনো ভালো, কখনো তা মানুষের জন্য খারাপ। ষাটের দশকে হরতাল ছিল ভিন্নতর। সাম্প্রতিককালের আন্দোলন থেকে সেই ম্যাজিক হারিয়ে গেছে। ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, হরতালের মধ্য দিয়েই দেশ স্বৈরশাসন মুক্ত হয়েছে, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যবহূত হয়েছে। অপরদিকে, হরতাল যদি অপ্রয়োজনে ব্যবহূত হয় তা দেশের জন্য মানুষের জন্য বিধ্বংসী চরিত্র হয়ে দেখা দিতে পারে। এ কে আজাদ বলেন, সাম্প্রতিককালে হরতাল দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করেছে। তাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হরতালেল খুব একটা প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না।
অজয় দাশগুপ্ত জানান, গ্রন্থটি দুই দশকের নিবিষ্ট পরিশ্রমের প্রকাশ। এ গ্রন্থের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে ৭০ বছরের প্রতিটি দিনের কোনো না কোনো জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় পড়তে হয়েছে। প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি।