ভেনিজুয়েলায় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হচ্ছে। এই সংকট বিশ্বকেও দুইভাগে ভাগ করে দিচ্ছে। দেশটিতে সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। দুই নেতার প্রতি পাল্টাপাল্টি সমর্থন অব্যাহত আছে। এরই মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতির তদন্ত দাবি করেছে জাতিসংঘ। যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলার পরিকল্পনা করছে। সেনাবাহিনীর সমর্থনে মাদুরো এখনো তার ক্ষমতা সুসংহত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এদিকে মার্কিন কূটনীতিকরা কারাকাস ছাড়তে শুরু করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, মার্কিন কূটনীতিকদের দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বৈধতা মাদুরোর নেই। খবর সিএনএন, রয়টার্স, বিবিসি ও আল জাজিরা’র
সহিংসতা অব্যাহত
ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে মাদুরোবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। গত চারদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। মাদুরোর সমর্থকরাও বিক্ষোভ করছে। কারাকাস ভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন অবজারভেটরি অব সোশ্যাল কনফ্লিক্ট জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
তদন্ত চায় জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মিচেল ব্যাসেলেটস’র অফিস এক বিবৃতিতে ভেনিজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতির তদন্ত দাবি করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের সময় সহিংসতার আন্তর্জাতিক তদন্ত করা প্রয়োজন। বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা অন্য কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে কিনা সেই বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। কারণ বিক্ষোভের সময় হতাহত কাম্য নয়। মানবাধিকার কমিশন বলছে, মঙ্গল ও বুধবারের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন নিরাপত্তা বাহিনী বা সরকারপন্থিদের গুলিতে নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আহবান জানিয়েছে।
মাদুরোকে সমর্থন দিল সেনাবাহিনী
ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মাদুরো এখনো দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট। গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দাবি করার পর বিরোধীরা ক্যু করার চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কিছু দেশ ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে সব ধরণের সন্দেহকে উড়িয়ে দিলেও মাদুরোর ভবিষ্যত্ এখনো অনিশ্চিত। গুয়াইদোর সেনাবাহিনীকে পক্ষ বদলানোর যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তার তীব্র নিন্দা জানান লোপেজ। এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, যিনি সন্দেহজনক স্বার্থ হাসিলের জন্য আইন বহির্ভূতভাবে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেছেন তাকে দেশের সেনারা কখনোই প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেবে না। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মন্ত্রিসভার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়েই রয়েছেন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা। যদিও ভেনেজুয়েলার সংবিধানে সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখার কথা বলা আছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো লোপেজও সেনাবাহিনীর কর্নেল হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। গত ২৫ বছরে ভেনিজুয়েলায় তিনবার অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে। সামপ্রতিক ইতিহাসে দেশটি তার সবচেয়ে খারাপ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মাদুরোর অর্থনৈতিক সংকটের সম্ভাবনা
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন, ভেনিজুয়েলার তেল রপ্তানির রাজস্ব যেন মাদুরোর হাতে না যায়, তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে ওয়াশিংটন। ওই রাজস্ব কীভাবে গুয়াইদোর কাছে পৌঁছানো যায়, যুক্তরাষ্ট্র তার সম্ভাব্য উপায়গুলো খতিয়ে দেখছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। অর্থনৈতিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত ভেনিজুয়েলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ পদক্ষেপ আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলেও ধারণা পর্যবেক্ষকদের। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভেনিজুয়েলাকে ২০ মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসভুক্ত দেশগুলোকে গুয়াইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাদুরো এখন আর ভেনিজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট নন। তিনি গুয়াইদোর নিরাপত্তা দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। এদিকে কারাকাসে মার্কিন দূতাবাস থেকে গতকাল কিছু কূটনীতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। তাদেরকে পুলিশের নিরাপত্তায় বিমানবন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় খুব বেশি প্রয়োজন নেই এমন কর্মকর্তাদের কারাকাস ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাজ্য গুয়াইদোকে সমর্থন দিয়ে বলেছে, তিনিই দেশটির শাসন ক্ষমতা পরিচালনার বৈধ ক্ষমতা রাখেন। পোপ ফ্রান্সিস দেশটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে ভ্যাটিকানে তার অফিসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মাদুরো যদি নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা না করেন তাহলে তারা গুয়াইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন। জার্মানি বলেছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন না দেওয়া হলে গুয়াইদোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাভিশ কুমার ভেনিজুয়েলার দুই পক্ষকে সংলাপের আহবান জানিয়েছেন। এদিকে মাদুরো এক টুইটার বার্তায় সমর্থন দেওয়ার জন্য রাশিয়া, চীন ও তুরস্ককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।