জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠনের একটি উদ্দেশ্যও বাস্তবায়ন করেননি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তার দুই পুত্র। এরা তিনজনই ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে করা এই ট্রাস্টের ট্রাস্টি। ওই ট্রাস্টের নামে তারা কে কি সম্পত্তি ট্রাস্ট করেছেন বা কি পরিমাণ অর্থ প্রদান করেছেন ট্রাস্ট দলিলে তারও কোনো উল্লেখ নেই। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান।
রায়ে বিচারক বলেন, খালেদা জিয়া (২০০১-২০০৬ মেয়াদে) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শহীদ মঈনুল রোডের বাসার নাম ব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট সৃষ্টি করেন। খালেদা জিয়া ওই ট্রাস্টের প্রথম ম্যানেজিং ট্রাস্টি ছিলেন। তিনি নিজ স্বাক্ষরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সোনালী ব্যাংক শাখায় ট্রাস্টের নামে সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন। সাক্ষ্য প্রমাণ ও নথি পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ওই ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা অবৈধভাবে জমা হয়েছিলো। বিএনপির দলীয় ফান্ড থেকে জমা হয় আরো ৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। বিএনপির দলীয় চেয়ারপারসনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কোনো সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ট্রাস্টের হিসাবে ওই দলীয় ফান্ডের অর্থ জমা হয়নি। অর্থাত্ কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়াই অনিয়মিতভাবে এবং অবৈধ উদ্দেশ্যে উক্ত টাকা ট্রাস্টের সঞ্চয়ী হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
রায়ে বলা হয়, খালেদা জিয়া জানতেন এই টাকা বেআইনি ছিলো। ট্রাস্টের প্রথম ম্যানেজিং ট্রাস্টি হিসাবে ট্রাস্টের নামে হিসাব খোলা এবং উক্ত হিসাবে তার অগোচরে কোনো টাকা পয়সা লেনদেন বা জমা হওয়ার কথা নয়। এছাড়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দলিলে বিএনপি দলীয় ফান্ডের টাকা গ্রহণ করা যাবে-এরকম কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। ওই ট্রাস্টে খালেদা জিয়া ও তার দুই পুত্র ব্যতীত অন্য কোনো রাজনৈতিক দলীয় ব্যক্তিও ট্রাস্টি নাই। ফলে বিএনপির দলীয় ফান্ড দ্বারা ব্যক্তিগত ট্রাস্ট পরিচালিত হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এর পরেও দলীয় ফান্ডের প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা অবৈধভাবে ব্যক্তিগত ট্রাস্টে হস্তান্তর করে বেআইনি কাজ করা হয়েছে। আর এ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে খালেদা জিয়ার তত্কালীন রাজনৈতিক সচিব আবুল হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর এপিএস জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও ঢাকা সিটির সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার এপিএস মনিরুল ইসলামের পরস্পর যোগসাজশে প্রধানমন্ত্রীর পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে।
রায়ে বলা হয়, ২০০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ট্রাস্টের হিসাবে ৮ কোটি ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫২৯ টাকা ছিলো। ওই টাকা থেকে কাকরাইলে ট্রাস্টের নামে কেনা ৪২ কাঠা জমি ও স্থাপনার মূল্য বাবদ ৬ কোটি ৫২ লাখ ৭ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। উক্ত অর্থ পরিশোধের পরেও বিনা কারণে একটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমির মালিক সুরাইয়া খানকে আরো ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা প্রদান করে খালেদা জিয়া অপরাধমূলক অসদাচরণ করেছেন। রায়ে বলা হয়, যদিও আসামি পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিলো ওই জমির উপর অবস্থিত বিভিন্ন স্থাপনা, দোকান শো রুমের দখল উচ্ছেদ করতে ওই টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে রায়ে বিচারক বলেন, সুরাইয়া খান তারেক রহমানের আপন চাচা শাশুড়ি। তারেক রহমান ঘটনার সময় রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। অনুরূপ অবস্থায় সুরাইয়া খান টাকা-পয়সা ব্যয় করে তার নামীয় জমির উপর অবৈধভাবে দখল গ্রহণ করা ব্যক্তিদের টাকা দিয়ে দখলচ্যুত করেছেন এটা কোনোক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা হতে পারে না।
প্রসঙ্গত এ মামলায় খালেদা জিয়া, হারিছ, মুন্না ও মনিরুলকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। গত অক্টোবর মাসে সদেয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ডিসেম্বর মাসে প্রকাশ পায়। এই রায়ের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে হাইকোর্টে আপিল করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।