বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার একটি ট্রলারের ইঞ্জিন রুমে রহস্যজনক বিস্ফোরণে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার অগ্নিদগ্ধ হওয়া ১২ জেলের মধ্যে আরও এক জেলে মারা গেছেন। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া জেলের নাম মো. মিরাজ (৪০)। তিনি উপজেলার চরলক্ষী গ্রামের মো. শিরাজের ছেলে। এ নিয়ে গত ৮ দিনে ওই ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ জেলের প্রাণ গেল।
এর আগে মারা যাওয়া ছয় জেলে হলেন, উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের দক্ষিণ টুমচর গ্রামের নুরউদ্দিনের ছেলে বেলাল হোসেন (২৮), একই গ্রামের সিরাজুল হকের ছেলে মো. মেহেরাজ (২৬), চরলক্ষী গ্রামের আবদুজ্জাহেরের ছেলে মো. মিলন (৩০), একই গ্রামের দেলোয়ারের ছেলে মো. মিরাজ উদ্দিন(২৫), চররমিজ ইউনিয়নের চরগোসাই গ্রামের মন্তাজল হকের চেলে আবুল কাশেম মিস্ত্রী (৫৫) এবং একই গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে মো. রিপন মাঝি (৩৮)। চরলক্ষী গ্রামের মো. আলাউদ্দিন, মো. সাহাবউদ্দিন, আবু জাহেরসহ ৪ জন ওই ইনস্টিটিউটে এবং অপর একজন বাড়িতে চিকিৎসাধীন আছেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন ৪ জনের অবস্থাও সংকটাপন্ন। তাদের শরীরের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পুড়ে গেছে। একে একে দগ্ধ জেলেদের মৃত্যুতে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে কক্সবাজারের অদূরে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় এফবি ওশিন নামের ওই ট্রলারের ইঞ্জিন রুমে হঠাৎ করে বিকট শব্দে একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ১২ জেলে অগ্নিদগ্ধ হয়।
জানা গেছে, কক্সবাজার এলাকার সোহেল কোম্পানির এফবি ওশিন নামের ট্রলারটি ২১ জন জেলে নিয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মাছ ধরার উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরে যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ট্রলারের ইঞ্জিন রুমে হঠাৎ করে বিকট শব্দে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ট্রলারের ১২ জেলে অগ্নিদগ্ধ হলে মাছ ধরার অপর ট্রলারের জেলেদের সহযোগিতায় তাদেরকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে চিকিৎসকরা তাদেরকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করেন। সেখানেও অবস্থার অবনতি ঘটলে তাদের মধ্যে ১১ জনকে ৪ মার্চ বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান।
ট্রলারের মাঝি উপজেলার চরগাজী এলাকার মো. মনির হোসেন জানান, ঘটনার সময় তিনি ট্রলারের কেবিনের ওপরে ছিলেন। এ সময় ইঞ্জিন রুমে আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ইঞ্জিন রুমে ও কেভিনের ভিতরে থাকা ১২ জেলে দগ্ধ হলে মাছধরার অপর একটি ট্রলারে করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে, ঠিক কী কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধ জেলেদের নিয়ে আসা হলে তাদের চিকিৎসায় এগিয়ে যায় রামগতির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্ন নিয়ে’। রোগীদের সেবায় স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা খরচের অর্থ সংগ্রহের জন্য কাজ করছে সংস্থাটি।
‘স্বপ্ন নিয়ে’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুল আলম হান্নান শনিবার সকালে মোবাইল ফোনে জানান, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিপদে পড়া জেলেদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা। গরীব জেলেদের চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন তিনি।
রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাওহীদুল ইসলাম সুমন জানান, অগ্নিদগ্ধ বেশিরভাগ জেলের বাড়িই তার এলাকায়। আর্থিক সঙ্কটের কারণে ওইসব জেলেদের পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ অবস্থায় তাদের চিকিৎসায় যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করার আহ্বানও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল মোমিন বলেন, কি কারণে জেলেদের ট্রলারে বিস্ফোরণ হয়েছে তার খোঁজখবর নেবো। অন্যদিকে খবর পেয়ে আহত ও মারা যাওয়া জেলেদের তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে তাদেরকে সহায়তা করা হবে।
অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রণীত জেলে সহায়তা নীতিমালা অনুসারে তারা কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, সেজন্য তাদেরকে নিবন্ধিত জেলে হতে হবে। তবুও তারা যেহেতু জেলে সেকারণে তিনি প্রস্তাব পাঠাবেন।
ইত্তেফাক/এমআর