চয়ন

অথ পুষ্পকথা

 

মানব সমাজের ইতিহাসে কুকুর এবং ফুলহীন জনপদ বোধহয় আবিষ্কার করা যাবে না। কৃষির অনেক আগে সে কুকুরকে সাথি করেছে। না-জেনেই বলছি, আমি জানি বাগানবিদ্যা আয়ত্ত করার অনেক আগেই সে ফুলকে ভালোবেসেছে। এ ধরনের সামান্যীকরণে বিপদ আছে জেনেও নির্ভয়ে বলছি। আমেরিকার সুসভ্য আদি বাসিন্দারা মানবজাতির সুখাদ্যের অধিকাংশ আবিষ্কার করেছিলেন—ভুট্টা আলু লাউ টকবেগুন ইত্যাদি এবং মানব জাতিকে উদ্ধার করেছিলেন কুইনাইন-তরু সিঙ্কোনার যথাব্যবহার প্রবর্তন করে। একটি কাজ তাঁরা খারাপ করেছিলেন—তামাক আবিষ্কার। সেই অশেষকীর্তিধন্য ইন্ডিয়ানরা নাকি ডালিয়ার চাষ করতেন খুব, কিন্তু ফুল দেখে মুগ্ধ হবার জন্য মোটেও নয়। ডালিয়ার শেকড়ে যে আদা-মতো হয় খাদ্য হিসেবে তার নাকি খুব আকর্ষণ ছিল তাঁদের কাছে।

ফুলকে না ভালোবাসার এইরকম একটা আধা-উদাহরণের বিপরীতে সেখান থেকে তিন হাজার মাইল দূরস্থ প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে হাওয়াই দ্বীপে এক মজার ঘটনা। প্রচুর আমগাছ। পলিনেশীয়রা কেউ আম খায় না। তবে লাগায় কেন? ফলবান সহকার শাখা কিংবা ভারাবনত পুরো রসাল বৃক্ষটিই দেখতে নাকি ভারি সুন্দর। চূতমঞ্জরী কি গন্ধে কি দর্শনে যে অপরূপ সে তো আমরাই সাক্ষাত্ জানি। ফলটিকে কেবল খাওয়ার অর্থাত্ জিহ্বার ভাষায় ভাবি বলে ফলশোভাটি আমাদের চোখে পড়ে না।

ডালিয়াতে যাই ফিরে। কংকিস্তাদোর স্পানিয়ার্ডরা ডালিয়াও অবশ্যই নিয়ে এসেছিলেন ইউরোপে। কিন্তু ডালিয়া খেতে তাঁদের ভালো লাগেনি (বরঞ্চ তামাক সেবনে সেদিন বিতৃষ্ণা হলে মানবজাতি যেত বেঁচে)। ডালিয়ার চাষ উঠে গেল। তার তিন শ বছর পর ডাল (Dahl) নামে এক সুইস উদ্ভিদবিদ্যাবিশারদ ভাবলেন, খেতে না-হোক, দেখতে তো ভালো। এই ফুলের ফিরে চাষ হলো, দুনিয়াময় ছড়াল যাঁর কল্যাণে তাঁর নামে তার নাম হলো ডালিয়া। 

(অংশবিশেষ)

লেখকের ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’ থেকে