আর কতো অরিত্রিকে এভাবে যেতে হবে?

রুমান হাফিজ 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের ছাত্রী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের আলোড়িত করেছে। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করা এবং নকল করার অভিযোগে তাকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ তার বাবা-মাকে ডেকে নেয় এবং অরিত্রির সামনেই তাদের দুইজনকে অপমান করা হয় বলেও অভিযোগ এসেছে। মা-বাবা দুইজনই সেদিন মেয়ের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেও সেদিকে কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করেনি উল্টো অরিত্রিকে টিসি দেওয়ার হুমকি দেয়। এতসব অপমান সইতে না পেরে শান্তিনগরে নিজের বাসায় গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে অরিত্রি।

যেসময়টাতে মানুষ রঙিন হতে শেখে, ভুল করতে করতে সঠিক পথ চিনতে পারে, সেটি নবম-দশম শ্রেণি। এই বয়সটা ভুল করার, আবার ভুল থেকে শিক্ষাও নেওয়ার। আর সেই শিক্ষাটা দিতে হয় শিক্ষক, অভিভাবকদের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে।’ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হবে, কেমন হওয়া উচিত এ নিয়ে সঠিক কোনো বিধি-বিধান নেই। যা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। ফলে কখনো শিক্ষক হয়ে উঠছেন প্রতিপক্ষ কখনো কখনো শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে প্রতিপক্ষ। এটি কখনোই কাম্য নয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যকার পরিবেশেও রয়েছে জটিলতা।  একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো তার বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দেন না। শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করা একজন আদর্শ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য, তাদের মেরে-বকা দিয়ে সাময়িকভাবে ভীতি সঞ্চার করা যায় কিন্তু প্রকৃত লক্ষ্য  অর্জন হয় না। জিপিএ-৫ কিংবা ভালো রেজাল্ট করলেই ভালো মানুষ হওয়া যায় না একথা তাদের বুঝাতে হবে।

 শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন করা যে-সকল শিক্ষকের মূল উদ্দেশ্য তাদের শিক্ষক না হয়ে ব্যবসায়ী হওয়া উচিত। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষকের দায়িত্ব এবং মর্যাদা আরো ওপরে। তিনি হবেন নির্লোভ, উদার ও সহযোগী মনোভাবাসম্পন্ন। তিনি যেমনি শিক্ষার্থীকে ভালোবাসবেন তেমনি প্রয়োজনে শাসনও করবেন। তারা আদর্শ হবেন, কখনো প্রতিপক্ষ হবেন না। মনে রাখতে হবে নৈতিক শিক্ষার দায়িত্ব শুধু পরিবারেরই নয়, এক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।     

আমাদের বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা প্রচুর মেধাবী, এ কথা বলার অবকাশ রাখে না। তারা অনেক এগিয়ে, তাদের কাছে আছে উন্নত প্রযুক্তি, গোটা বিশ্ব তাদের হাতের মুঠোয়। তারা দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, অনেক বড় স্বপ্ন। তারা তাদের জায়গা থেকে কাজ করে, সফল হয়। তখন শিক্ষক, অভিভাবক আমরা সবাই খুশি হই, আহলাদিত হই। তারা হোঁচট খায়, উঠে দাঁড়াতে গিয়ে যখন কাউকে পাশে পায় না তখনই হতাশ হয়। জীবনের মানে শুধু জয় নয়, পরাজয় থেকেও শিক্ষা নেওয়া। পিছলে পড়ে থেমে যাওয়া নয়, এখান থেকে উঠে আসা এবং এগিয়ে যাওয়া। হোঁচট খেতে খেতে সফল হতে হয়। একথাগুলো তাদের বুঝতে দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা। পাশাপাশি তাদের কোমল চিন্তা-চেতনাকে লালন করতে হবে এবং এর বিকাশে ভূমিকা রাখতে হবে।          

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নানাদিক নিয়ে আলোচনা চলছে। শিক্ষা পদ্ধতির পূর্ণতার জন্য শিক্ষার পরিবেশ আরো উন্নত আরো সমৃদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি। শিক্ষকরা হবেন শিক্ষার্থীদের আদর্শ, তাদের আচরণ হবে বন্ধুসুলভ, কখনো অসহনশীল কিংবা প্রতিপক্ষ হবেন না। আমরা অরিত্রিকে ফিরিয়ে আনতে পারবো না ঠিক। তবে আর যেন কাউকে অরিত্রির মতো ভুলের মাসুল দিতে না হয়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

n লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়