পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে ধীরগতি কেন?

মো. আজহারুল ইসলাম

বর্তমান পৃথিবীতে পর্যটন একটি সমৃদ্ধ এবং সফল শিল্প। পৃথিবীতে  অনেক দেশ বিদ্যমান যাদের আয়ের সবচেয়ে বড় খাত এই পর্যটন শিল্প। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর পর্যটন খাত তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তন্মধ্যে ভারত, চীন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ অন্যতম। এমন কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র পথ পর্যটন শিল্প। এই সমস্ত দেশে পর্যটনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যাপক সংখ্যক লোক। ফলে জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছে। যে-কোনো দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের চাকা গতিশীল করার জনা পর্যটন শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ সাধন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয় উক্ত দেশকে বিশ্বমন্ডলে পরিচিতি লাভের সুযোগের সম্প্রসারণ করে এই পর্যটন শিল্প।

আমাদের পর্যটন স্পটগুলোর মাঝে সুন্দরবন যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত। সুন্দরবনকে বলা হয় পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। প্রাকৃতিক  সৌন্দর্যের আধার বলে বিবেচিত এই বনের ৬২% অংশ আমাদের দেশের খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালির অঞ্চলসমূহে জুড়ে আছে। জানা যায় এই  বনভূমিতে আছে প্রায় ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩২০ প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি, প্রায় ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। সুন্দরবনে দুই ধরনের হরিণ দেখা যায়। যেমন-মায়া হরিণ (Braking Deer) ও চিত্রা হরিণ (Spotted Deer)। বনের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মাঝে কটকা, হিরণ পয়েন্ট, দুবলারচর ও টাইগার পয়েন্টে প্রতিবছরই দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটকদের আগমন ঘটে। সুন্দরবনের দক্ষিণ উপকূলে দুবলার চর (জাফর পয়েন্ট)। বনের ভিতর ছড়িয়ে রয়েছে জালের মত ছোট বড় অনেক নদী। নদীগুলোকে বলা হয় নোনা পানি ও মিঠা পানির মিলন স্থান। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা বলেন, ‘গঙ্গা থেকে আসা নদীর মিঠা পানির, বঙ্গোপসাগরের থেকে নোনা পানি মিলিত হয় এই এলাকায়’ নিউজপ্রিন্ট, দিয়াশলাই, হার্ডবোর্ড, নৌকা, আসবাবপত্রসহ অসংখ্য শিল্প সুন্দর বন থেকে আহরিত কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের সৌন্দর্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

সাগর-কন্যা হিসেবে পরিচিত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত যা পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত। কুয়াকাটা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং দুটো-ই ভালোভাবে অবলোপন করা যায়। সবচাইতে ভালোভাবে সূর্যোদয় দেখা যায় সৈকতের গঙ্গামতির বাঁক থেকে আর সূর্যাস্ত দেখা যায় পশ্চিম সৈকত থেকে। এই সাগর সূর্যসাগরের কন্যার আয়তন ১৮ কিলোমিটার। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা রাঙ্গামাটি, বান্দরবানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের যুগ-যুগ ধরে বসবাসরত চাকমা, মারমা, মুরংসহ উপজাতিরা তুলনামূলক সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার কারণে তারা পর্যটন শিল্পের স্থানীয়রা পারছে না অগ্রসর হতে। এত সম্ভাবনাময় স্থান থাকা সত্ত্বেও যথার্থ অবকাঠামোর অভাবে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে না, বৈদেশিক পর্যটকরা ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব বিদ্যমান। পর্যটন স্পটগুলোতে চুরি-ছিনতাই, রাহাজানি এখনকার নৈমিত্তিক ঘটনা। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে অন্যতম এক প্রতিবন্ধক। রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে অন্যতম বাধা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভ্রমণের আগ্রহ স্তিমিত করে ফেলে। গত তিন-চার বছর ধরে ঈদের ছুটির সময়ে কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি বা বান্দরবানের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো পরিপূর্ণ বলে পত্রিকাগুলোতে খবর দেখা যায়। এমনও শোনা গেছে, হোটেলে জায়গা না পেয়ে অনেককেই গাড়িতে রাত কাটাতে হয়।

এই তো মাস তিনেক আগে বিশ্ব উদযাপন করল বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল:Tourism and Digital Transformation অর্থাত্ পর্যটন শিল্পের বিকাশে তথ্য ও প্রযুক্তি। প্রাকৃতিক সম্পদের সৌন্দর্যে ভরপুর আমাদের মাতৃতূল্য ভূমিতে পর্যটন শিল্প একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না বর্তমানে পর্যটন শিল্পের দিকে ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে তবুও পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে রূপ দেওয়ার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। যদি এই সমস্ত প্রতিবন্ধকগুলো চিহ্নিত করে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাহলে পর্যটন শিল্পে বৃদ্ধি পাবে নতুন উদ্যোক্তার সংখ্যা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র। বাংলাদেশকে আগামী ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে অবশ্যই এই শিল্পকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে এবং পর্যটক আগমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি, পর্যটন আকর্ষণের বহুমুখিতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান এবং পর্যটন বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ফলশ্রুতিতে একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত বিকাশমান এই শিল্প তার বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে করবে আরও ত্বরান্বিত।

n লেখক:শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়