বাঘায় দেড় মাসে ২৮ জনের আত্মহত্যার চেষ্টা, ২১ জনই শিক্ষার্থী

রাজশাহীর বাঘায় উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে আত্মহত্যা চেষ্টার প্রবণতা। সম্প্রতি পত্রিকার পাতা উল্টালেই কমবেশি আত্মহননের নিষ্ঠুর সংবাদ চোখে পড়ে। সমাজ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন কোনো ব্যক্তির জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও উপলব্ধি-অনুধাবন শক্তি লোপ পায়, অসুস্থ হয়ে নিজেকে অসহায়-ভারসাম্যহীন মনে করেন, ঠিক তখনই ধর্ম-কর্ম ভুলে মানুষ আত্মহত্যা করে মুক্তির উদ্দেশ্যে। ৪০ থেকে ৭০ বছরের মানুষের মধ্যে সাধারণত এ প্রবণতা বেশি থাকে। 

কিন্তু বাঘার চিত্র পুরোপুরি উল্টো। এই অঞ্চলে গত দেড় মাসে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন ২৮ জন। এদের মধ্যে ২১ জনই শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যে বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জরুরি বিভাগ। তাদের মতে, মনস্তাত্ত্বিক চাপ, অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা এবং অপমানজনিত কারণে দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিরা আত্মহননের মধ্য দিয়ে মুক্তি খোঁজে। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ বছর  বয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের আত্মহত্যার চেষ্টায় উদ্বিগ্ন হচ্ছেন অভিভাবকরা। 

সরেজমিনে নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিষণ্ণতা, শিক্ষাজীবন নিয়ে হতাশা, বন্ধুত্ব সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েন এবং চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তাসহ প্রণয় ঘটিত ব্যর্থতার কারণে তারা বিষপানে আত্মহননের চেষ্টা চালিয়েছেন। 

আত্মহত্যার ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। এদিক থেকে বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। পুলিশ সদর দফতরের হিসেব অনুযায়ী শুধু ২০১৭ সালেই বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছিল ১১ হাজার ৯৫ জন। যার গড় হিসেবে দাঁড়ায় দিনে ৩০ জন। এ সংখ্যা ২০১৬ সালে ছিল ১০ হাজার ৬শ’ এবং ২০১৫ সালে ছিল ১০ হাজার ৫শ’ জন। তবে আত্মহত্যার চেষ্টা করে-এর চেয়ে আরও ১০ গুণ বেশি।

বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলামের মতে, আত্মহত্যার দুটি ধরণ আছে, (১) পরিকল্পিতভাবে এবং (২) আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা। বাংলাদেশে অধিকাংশ তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার ঘটনা আবেগতাড়িত। হতাশা, প্রেমে ব্যর্থ, পরীক্ষার ফল খারাপ, বাবা মায়ের সঙ্গে ঝগড়াসহ ছোটখাটো বিষয়েই আবেগতাড়িত হয়ে অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এ দিক থেকে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। এর পেছনে রয়েছে আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা, নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, সম্ভ্রমহানি, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ইত্যাদি।

সার্বিক বিষয়ে বাঘা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান কর্মকর্তা (টি.এইচ.ও) ডা. রাশেদ  আহাম্মেদ জানান, আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনা শুধু বাঘাতে নয়, এটি সারা দেশব্যাপী সংক্রমণে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগছেন। আর বাংলাদেশে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ ৭৪ লাখেরও বেশি। বিগত ১০ বছরে বিশ্বব্যাপী এ রোগের ব্যাপকতা বেড়েছে ১৮ শতাংশ। নানা কারণে একজন মানুষের মধ্যে বিষণ্ণতা সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে পারিবারিক কলহের কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ বিষণ্ণতা, একাকীত্ব কিংবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি