ভেনিজুয়েলায় সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অভিযোগ করেছেন, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল। এই চেষ্টাই দেশকে রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। গতকাল রবিবার মার্কিন টেলিভিশন সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে মাদুরো বলেন, ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের শিকার। কারণ দেশটি চায় না আমরা ভাল থাকি। মাদুরোর অভিযোগ, নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে সংবিধান লংঘন করেছেন ‘মার্কিন পুতুল’ তথা বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো। এদিকে মাদুরোর পক্ষ ত্যাগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক দূত হিসেবে দায়িত্বরত সেনা কর্মকর্তা কর্ণেল সিলভা। তিনি বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে সমর্থন দিয়ে জনগনের ওপর গুলি না চালাতে সেনাবাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

মাদুরো যা বললেন

সিএনএন’র তুর্কিশ নেটওয়ার্ককে প্রেসিডেন্ট মাদুরো বলেন, গুয়াইদো কিভাবে সংবিধান লংঘন করেছে সেটি দেখার বিষয় অ্যাটর্নি জেনারেলের। আমি তো অ্যাটর্নি জেনারেল না। বিচার বিভাগও বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে আমরা অপেক্ষায় আছি। গুয়াইদো নিজেকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে নিজেকে ঘোষনা দেওয়ার আগের দিন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বিরোধী নেতাকে (গুয়াইদো) পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এ সম্পর্কে মাদুরো বলেন, এতেই প্রমাণিত হয় ভেনিজুয়েলা মার্কিন ষড়যন্ত্রের শিকার।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার দেশের (ব্রিটেন, স্পেন, জার্মান এবং ফ্রান্স) আট দিনের আল্টিমেটাম প্রত্যাখান করে প্রেসিডেন্ট মাদুরো বলেছেন, কেউ আমাদের আল্টিমেটাম দিতে পারে না। এর মাধ্যমে ইইউ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকার করছে উল্লেখ করে মাদুরো বলেন, ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেই এটি বেশি প্রযোজ্য। মাদুরো জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তিনি অনেক বার্তা পাঠিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প কোনোটিই গ্রহণ করেননি। আমার মনে হয় তিনি নিজ দেশের সমস্যা নিয়ে গলদঘর্ম অবস্থায় আছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল ভেনিজুয়েলাকে অবজ্ঞা করছেন না, তিনি সকল আমেরিকান, ক্যারিবিয়ান এবং সর্বোপরি বিশ্বকে অবজ্ঞা করছেন। মাদুরোর মতে, এটাই হয়তো অভ্যুত্থান চেষ্টার কারণ। ভেনিজুয়েলার মানুষ ভাল থাকুক যুক্তরাষ্ট্র সেটা চায় না উল্লেখ করে মাদুরো বলেন, দেশটি আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করে আমাদেরকে ধ্বংস করতে চায়। এদিকে জাতিসংঘ সহিংসতা ছেড়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। সংলাপের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর আহবান জানিয়েছেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি।

জনগনের ওপর গুলি নয়

ওয়াশিংটনে কারাকাসের দূতাবাসে রেকর্ড করা এক ভিডিওতে সিলভা গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দিতে সেনাবাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি সেনাবাহিনীর সদস্যদের ‘ভাই’ উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে আপনারা নিজ দেশের জনগনের ওপর গুলি চালাবেন না। আমাদেরকে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য, জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নয়। তিনি বলেন, আমাদের সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সৈন্যদের জিম্মি করে রেখেছেন। তাদের অনেকে অসন্তুষ্ট হলেও কিছু বলতে পারছেন না। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আরো দু’টি কনস্যুলেট গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এর সতত্য নিশ্চিত করা যায়নি। গুয়াইদো সিলভার বার্তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে মাদুরো সরকার সিলভাবে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এর আগে মাদুরোকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। সমপ্রতি মাদুরোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা একটি সেনাদলকে সরকার গ্রেপ্তার করে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র গ্রেট মারকুইস সিলভাকে অনুসরন করতে সেনাবাহিনীর অন্য সদস্যদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাংবিধানিক নির্দেশ মানতে হবে, কোনো একনায়কের নয়।

মার্কিন কূটনীতিকরা থাকবেন!

সিএনএনকে সাক্ষাত্কার দেওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট মাদুরো যুক্তরাষ্ট্র ইস্যুতে সুর নরম করেন। মাদুরো মার্কিন কূটনীতিকদের দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশ থেকে তিনি সরে এসেছেন। তিনি বলেছেন, বাকি মার্কিন কূটনীতিকরা থাকতে পারবেন। ৩০ দিনের মধ্যে সমঝোতা করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আহবান জানিয়ে মাদুরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ রক্ষায় ভেনিজুয়েলায় একটি অফিস করতে পারবে। ঠিক একইভাবে আমাদের একটি অফিস যুক্তরাষ্ট্রে থাকবে। উল্লেখ্য, একই ধরনের মার্কিন অফিস কিউবায় আছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরো বলেন, দুই দেশ সমঝোতা করতে ব্যর্থ হলে সব মার্কিন কূটনীতিকদের দেশ ছাড়তে হবে। আমরাও যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের মিশন বন্ধ করে দেবো। তিনি বলেন, আমরা উত্তর আমেরিকার উপনিবেশ হতে চাই না। এ বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো মন্তব্য করেনি। মাদুরো গুয়াইদোকে ‘মার্কিন পুতুল’ উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সঙ্গে আলোচনায় রাজি বলে জানিয়েছেন।

চাপের মুখে স্বীকার গুয়াইদোর

একটি ভিডিও নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন গুয়াইদো। অবশেষে শনিবার স্বীকার করেন, তিনি গোপনে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। আইনপ্রণেতা ক্যাবেলো গত সপ্তাহে এই বৈঠকের কথা জানিয়েছিলেন। ক্যাবেলোর সঙ্গে বৈঠকে মাদুরোর শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ফ্রেডি বার্নাল ছিলেন। ওই বৈঠকের সব বক্তব্য রেকর্ড করেছিলেন ক্যাবেলা। পরে তিনি তা টুইটারে ছড়িয়ে দেন। বৈঠকে গুয়াইদো নতুন নির্বাচনে সমর্থন দিতে সবার প্রতি আহবান জানান। তখন ক্যাবেলা বলেন, নতুন নির্বাচন হতে পারে কেবল জাতীয় পরিষদের যার নেতৃত্বে আছেন গুয়াইদো।