নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার টিপুরদী এলাকার একটি শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের প্রভাবে ৩০টি গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কারখানার ওই বর্জ্য পার্শ্ববর্তী বিল ও খালে ফেলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
সরেজমিন ওই এলাকায় গেলে এলাকাবাসী জানায়, টিপুরদী এলাকায় অবস্থিত চৈতি কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান ২০০৬ সাল থেকে তাদের উত্পাদন কাজ চালিয়ে আসছে। কারখানাটি পরিশোধনাগার (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা ইটিপি) যথাযথ ব্যবহার না করে সুতা তৈরি ও সুতা রং করার তরল বর্জ্য মারিখালি নদীর সংযোগ খালে ফেলছে। এ বর্জ্যের প্রভাবে সোনারগাঁও পৌরসভার টিপুরদী, রতনদী, বসুরবাগ, তাজপুর, গোয়ালদী, মল্লিকেরপাড়া, গৌরবর্দী, মোগড়াপাড়া ইউনিয়নের বাড়িমজলিস, বাড়ি চিনিস, মোগরপাড়া, ছোট সাদিপুর, বন্দেরা, ফুলবাড়িয়া, গোহাট্টা, সোনাখালী, ডহরপাড়া, দলদার, বিন্নিপাড়া, কাবিলগঞ্জ, লেবুছাড়া, ভাটিপাড়া, বড় সাদীপুর, যোলপাড়া, দমদমাসহ ৩০ গ্রামের লোকজনের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গত ১২ বছরে এ বিষাক্ত বর্জ্য মিশ্রিত পানি পান করে অনেক গবাদিপশু মারা গেছে। এছাড়া চর্ম রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে কয়েক শ’ মানুষ। ঐসব গ্রামের মানুষ পুকুর ও নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। কারখানার এ তরল বর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল ও পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করার পর গত ২০০৮ সালের মার্চ মাসে যৌথবাহিনী ও পরিবেশ অধিদপ্তর কারখানাটির উত্পাদন বন্ধ করে দেয়। কিছু দিন বন্ধ থাকার পর কারখানাটির বর্জ্য খাল ও গ্রামবাসীর জমির ওপর দিয়ে নিষ্কাশন করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কারখানাটি আবার চালু করা হয়। সম্প্রতি কারখানাটি ইটিপি স্থাপন করলেও তা ব্যবহার করছে না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
বর্তমানে কারখানা সংলগ্ন সোনারগাঁও পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর লায়ন মোশারফ হোসেনের বাড়ির সামনে ও পেছন দিক দিয়ে পাইপে তরল বর্জ্য কারখানার খোলা জমিতে ফেলা হচ্ছে। এতে ওই বাড়ির কয়েকটি পুকুরের মাছ মরে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মোশারফ হোসেন। টিপুরদী এলাকার আব্দুল খালেক প্রধান জানান, কারখানাটি গোপন নালা দিয়ে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলছে। বিষাক্ত বর্জ্যের দুর্গন্ধের কারণে লোকজন মুখে কাপড় বেঁধে চলাচল করছে।
সোনারগাঁও পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বর্তমান কাউন্সিলর মোতালেব মিয়া জানান, কারখানার বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করা হচ্ছে। এলাকার মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সোনারগাঁও পৌরসভার মেয়র মোঃ সাদেকুর রহমান জানান, চৈতি কম্পোজিটের বর্জ্য খোলা জমিতে ফেলা হচ্ছে বলে সত্যতা রয়েছে। বর্জ্য পার্শ্ববর্তী খালে নিষ্কাশন করায় এলাকাবাসীর বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তাদের বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্কাশনের বিষয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে কোনো কর্নপাত করেনি। এ ব্যাপারে চৈতি কম্পোজিটের উপ-ব্যবস্থাপক বদরুল আলম জানান, আমরা আমাদের ইটিপি’র মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে আমাদের নিজস্ব জমিতে ফেলছি। আমরা কারখানার পানি এখন আর খালে নিষ্কাশন করছি না। মাটির রং কালো তাই পানির রং কালো দেখাচ্ছে। চৈতি কম্পোজিটের উপ-ব্যবস্থাপক (এডমিন) মিজানুর রহমান জানান, আমরা শতভাগ পরিবেশ আইন মেনে পানি শোধন করে আমাদের জমিতে পানি ছাড়ছি। তবে এ পানিতে ক্ষতিকারক দ্রব্য নেই।
সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহিনুর ইসলাম জানান, এ কারখানার দূষিত বর্জ্যের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের ক্ষতি হোক এটা খারাপ। তারা ইটিপির মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করছে বলে জানি। তবে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।