স্বাধীনতা দিবসের দিন সকালবেলা। চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ভিড়টা প্রতিদিনকার চেয়ে কিছুটা ভিন্নই বলা যায়। তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে মুখরিত এই স্থানে গিয়ে দেখা যায়, অনুষ্ঠিত হচ্ছে 'ছবি উৎসব' নামক একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী। স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন, চট্টগ্রামের সুপরিচিত ফটোগ্রাফিক সংগঠন 'চাটগাঁর ছবিয়াল-এর ৪র্বর্ষপূর্তি উপলক্ষেই এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী। প্রদশর্নীটি মূলত শুরু হয় ২৫শে মার্চে। দেয়ালে ঝুলছে চারকোনা ফ্রেম। প্রতিটি ছবিরই মূল বিষয় বাংলাদেশ। দেশের নানান প্রান্তে গড়ে ওঠা নানান স্থাপনা কিংবা দেশের প্রকৃতির গল্প ইত্যাদি রীতিমতো ফুটে উঠছে প্রদর্শনীর চারকোনার বদ্ধ ফ্রেমে। প্রতিটি ছবির গল্পই যেন সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতা দিবসের পূর্বদিন, বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে বেলুন উড়িয়ে দুইদিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকী। এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সাবেক সভাপতি মওদুদ আলম, ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি (আইওপি) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কে ইউ মাসুদ।
প্রধান অতিথি শোয়েব ফারুকী তাঁর বক্তব্যে বলেন, "একটি ছবির মাধ্যমেই সম্ভব হাজারো শব্দকে এক ফ্রেমে বন্দী করা। আলোকচিত্র মানে শুধুই ছবি নয়, এটি একটি শিল্প, মনের ভাষা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম, এই শক্তিশালী মাধ্যমেই সম্ভব লক্ষাধিক গল্প একত্রে আনা। কেবল মাত্র একটি ছবিই হতে পারে হাজারো না বলা কথার সমান। চাটগাঁর ছবিয়ালের সদস্যরা ছবির মাধ্যমে হাজার শব্দের গল্প এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তুলে ধরছেন"।
চট্টগ্রামে ছবি নিয়ে কাজ করা এই সংগঠনের তেরো সদস্য ও পাঁচজন শুভানুধ্যানের মোট তেত্রিশটি ছবি প্রদর্শিত হয়েছে প্রদর্শনীটিতে। এই প্রদর্শনীর পেছনে ছিল একটি ভিন্ন উদ্দেশ্য। সে গল্প শোনা হলো প্রদর্শনীর অন্যতম আয়োজক, চাটগাঁর ছবিয়ালের সভাপতি মইন চৌধুরীর মুখ থেকেই। মইন বলেন, "দেশের অনেক মানুষ কোভিডের প্রভাবে কাজ হারিয়ে অর্থাভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা চাই এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে, ছবির ফ্রেমেরর বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে, যাতে কিছুটা কিছুটা ক্ষতি তারা পুশিয়ে নিতে পারে"। সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রুবেলের মতে, এই কাজের মাধ্যমে কিছু মানুষের মুখে হাসি ফুটলে এটিই যেনো তাদের সার্থকতা।
জানা গেল, চাটগাঁর ছবিয়াল বিভিন্ন সময়ে ছবির প্রতিযোগীতাসহ নানান ইভেন্ট আয়োজন করে আসছে। আয়োজন করেছে ফটোওয়ার্ক ও ফটোগ্রাফি কর্মশালা। ছবি নিয়েই তাদের কাজ। ছবিতেই ফুটিয়ে তুলেন শিল্পী মনের যত ভাবনা। একে একে তিনটি বছর অতিক্রম করে সংগঠনটি পা রেখেছে চতুর্থ বর্ষে। সেই সাথে এবার যোগ হয়েছে স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীর আনন্দ।
প্রদর্শনীর এক কোনায় চোখ আটকালো একটি ছবিতে। বিভিন্ন তলায় মসজিদে নামাজ পড়ছেন শত মুসল্লী, এমন একটি ছবি। "অনেক আগে তুলেছিলাম এই ছবি, এটি ছাড়াও আমার বেশকয়েকটি ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে, এরকম একটি আয়োজনের সাথে থাকতে পেরে নিজের অজান্তেই ভালোলাগা কাজ করছে", বলছিলেন বর্ণনা দেওয়া ছবিটির আলোকচিত্রী ও চাটগাঁর ছবিয়ালের সহ-সভাপতি কাজী জহিরুল ইসলাম। শুধু এটি নয়, প্রদর্শনীর এই ছবিটির মতোই মানুষের মন কেড়ে নিচ্ছে অন্যান্য ছবিও। হয়তো এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তেমন বড় ধরণের পরিবর্তন সম্ভব নয়, কিন্তু নিজেদের কষ্টে অন্তত একজনের মুখেও অন্নের জোগান দিয়ে নিজেদের অর্জন খুঁজে নিতে চান প্রতিটি সদস্য।
ইত্তেফাক/এসটিএম