লকডাউনে বাংলাদেশ। যখন লেখাটি লিখছি, জানালা দিয়ে বাইরের ব্যস্ত রাজপথের যে দৃশ্যটি দেখতে পাচ্ছি, তা অবশ্যই ইউরোপের লকডাউনের যে ছবিগুলো আমরা টিভির পর্দায় দেখে অভ্যস্ত, তার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। এমনকি গত বছরের সাধারণ ছুটির ঢাকার চিত্র থেকেও এটি আলাদা। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে লকডাউন, না কি লকডাউন না?
লকডাউন শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় এক বছরের অল্প কিছু বেশি সময় আগে। পরিচয়টা প্রথমে চীনাদের হাত ধরে আর তারপর ইউরোপের ছবি দেখে দেখে। পৃথিবীর এই দুই অংশের লকডাউনের ভিন্নতাও কিন্তু স্পষ্ট। লকডাউন বললেই চলে আসে বাস্তবায়নের প্রশ্নটি আর সঙ্গে চলে আসে পুলিশিংয়ের ব্যাপারটাও। চীনে যত কড়াকড়িভাবে লকডাউন করা গিয়েছিল ততটা কড়াকড়ি ছিল না ইউরোপে। আর এর কারণটাও স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক সমাজে চীনা মডেলের লকডাউন বাস্তবায়ন অসম্ভব। কোভিডে আক্রান্ত রোগীর স্বজনদের চীনা পুলিশের বাসা থেকে টেনেহিঁচড়ে কোয়ারেন্টাইনে যেতে বাধ্য করার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আমাদের দেখা। কাজেই আমরা যদি চীনা ধাঁচের লকডাউন এদেশে প্রত্যাশা করি, তাহলে তা হবে আশার গুড়ে বালি।
একই ভাবে ইউরোপের মতো লকডাউনও এদেশে সম্ভব নয় নানা কারণে। ইউরোপের দেশগুলোর জনসংখ্যা আমাদের তুলনায় অনেক কম আর পাশাপাশি তারা সার্বিক সক্ষমতায় আমাদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে। লকডাউন যে দেশে বা যে অঞ্চলে করা হবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখেই।
যদি বাংলাদেশের কথা ধরা হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের বাস্তবতাগুলো মাথায় রাখতে হবে। এদেশে ১৭ কোটি মানুষের বসবাস মাত্র ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারে। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ নির্ভর করে থাকে। কঠোর এবং পুরোপুরি লকডাউনে অর্থনীতির চাকা ঘোরা বন্ধ হয়ে গেলে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের আমজনতার। যে কারণে আমরা নিউ মার্কেট-গাউছিয়ার ব্যবসায়ীদের এবারে লকডাউনের বিরুদ্ধে রাস্তায় দেখছি আর ফরিদপুরের সালথায় দেখছি বিক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের অসহিষ্ণু আচরণ। আমাদের দেশের বাস্তবতায় তাই চীনা বা ইউরোপীয় ধাঁচের লকডাউন বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু কোভিড থেকেও তো বাঁচতে হবে!
বাংলাদেশে এরই মধ্যে কোভিডের তিনটি আলোচিত ভ্যারিয়েন্টের প্রতিটি শনাক্ত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন গবেষণা-প্রতিষ্ঠান থেকে এরই মধ্যে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা (জিআইএসএইড)-এ সংক্রান্ত জিনোম সিকুয়েন্সগুলো জমা দেওয়া হয়েছে। এটি জার্মান সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে করোনা ভাইরাসের সব ধরনের জিনোম সিকুয়েন্সের তথ্য জমা রাখা হয়। দেখা গেছে, শুধু ঢাকা আর চট্টগ্রামেই নয়, বরং দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্টগুলো। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট দুটি পাওয়া গেছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আর ব্রাজিলেরটি গত মার্চে। এসব ভ্যারিয়েন্ট ক্ষেত্রবিশেষে ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রামক। পাশাপাশি ধারণা করা হয়, এদের কোনোটির কারণে হয়তো রোগের তীব্রতাও বাড়তে পারে। এমনি পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলো যে আরো কঠিন হতে যাচ্ছে সেটা তো বলাই বাহুল্য।
অর্থাত্ আমাদের সামনে একদিকে যেমন করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টগুলোকে মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জটা থাকছে, তেমনি থাকছে এমন একটা বাস্তবতা, যেখানে লকডাউন অর্থে লকডাউন অসম্ভব। গত বছর কোভিডের প্রথম ধাক্কাটা সামলে ওঠায় আমরা আমাদের ‘জীবন-জীবিকা মডেলে’ সাফল্য পেয়েছিলাম। আমাদের মডেলটি এমনকি প্রশংসিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। এখনো আমাদের সেখান থেকে সরে আসার কোনো উপায় নেই।
তবে এবারের চ্যালেঞ্জটা যেহেতু গতবারের চেয়ে অনেক বড়, তাই এবারে জীবন আর জীবিকাকে পাশাপাশি, সমানতালে চলতে দেওয়ার সুযোগটা বোধ করি একটু কম। এবারে আমাদের ‘জীবনকে’ কিছুটা হলেও ‘জীবিকার’ চেয়ে এগিয়ে রাখতে হবে। আমার দৃষ্টিতে আমাদের সরকারের অবস্থানটাও এবার তেমনই। সরকারি কোনো কাগজপত্রে আমার জানামতে লকডাউনের উল্লেখ নেই। আবার গতবারের মতো ‘সাধারণ ছুটিও’ বলা হয়নি। বরং এবারের সরকারি ভাষাটি হচ্ছে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’।
আর এই কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এবারের কঠিনতর চ্যালেঞ্জটা উতরাতে হলে জনগণের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যা-ই বলি না কেন, গত বছর আমরা বিধিবিধানগুলো মেনে চলায় অনেক বেশি সচেতন ছিলাম। যে কারণে ঢাকার রাস্তায় ছিল ফুলের সমারোহ আর কক্সবাজারে বিচের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছিল ডলফিন। অথচ এবার ঢাকার সড়কে যানজট। আমরা যদি করোনার এবারের ঢেউটা মোটামুটি সহনীয়ভাবে কাটিয়ে উঠতে চাই, তাহলে আমাদের নিদেনপক্ষে গত বছরের জায়গাটায় ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আর তার চেয়ে ভালো করা গেলে তো কথাই নেই।
n লেখক : চেয়ারম্যান, হেপাটোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ