ঠান্ডা বার্গার যা বলতে চায়

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির তাপমাত্রা এখন মাইনাসের আশেপাশে। তুষার আর ঠান্ডার ধারাল নখ আঁচড় কাটছে রাজধানীর সর্বত্র। তবে ওয়াশিংটনের জন্য এটাই এখন একমাত্র অস্বস্তির কারণ নয়। দীর্ঘ ৩৫ দিনের অচলাবস্থায় একরকম বিধ্বস্ত ওয়াশিংটন ডিসি। আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন, বিশ্বের সবচাইতে ধনী ও শক্তিশালী দেশের পরাক্রমশালী সরকারের শাটডাউন অবস্থা বহাল রইল পাঁচ সপ্তাহ ধরে!  এতে করে একটি ব্যাপার অবশ্য স্পষ্ট হলো যে, আমেরিকা আর কখনো অসুরক্ষিত থাকেনি এতখানি।

কিন্তু কেন এই অচলাবস্থা? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে, ৫৭০ কোটি ডলার দিতে হবে আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য। কিন্তু সেই প্রস্তাব সমর্থন করেনি মার্কিন হাউস। শুরু হয় শাটডাউন, মাস পেরিয়ে যায়, বেতন আটকে যায় কমপক্ষে ৮ লক্ষ ফেডারেল কর্মীর। এই অবস্থায় শাটডাউন কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সিনেটে দুটো বিল আনা হয়। প্রথমটি রিপাবলিকানদের আনা বিল, যাতে বলা হয় সীমান্তে দেয়াল তোলার জন্য ট্রাম্পের ৫৭০ কোটি ডলারের প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে। বিনিময়ে বেআইনিভাবে আসা অভিবাসীদের আমেরিকায় থাকার মেয়াদ তিন বছর বাড়ানো হবে। দ্বিতীয়টি ডেমোক্র্যাটদের আনা বিল—যাতে শাটডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত ফেডারেল কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য অনুদান মঞ্জুর করা হবে। বিলগুলি সেনেটের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য ৬০টি ভোটের দরকার ছিল। দেয়ালের অর্থ অনুমোদনের বিলটি ৫০-৪৭ ভোটে এবং দ্বিতীয় বিলটি ৫২-৪৪ ভোটে খারিজ হয়ে যায়। তবে সর্বশেষ অচলাবস্থা কাটাতে গত শুক্রবার একটি প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে পাস হয়। এর ফলে গত ২২ ডিসেম্বর থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চলা ৩৫ দিনের শাটডাউনের অবসান ঘটে। আপাতত আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তহবিলের সংকট কাটল বটে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই অঙ্গীকার করেছিলেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ না দিলে তিনি বছরের পর বছর শাটডাউন অব্যাহত রাখবেন।

এখন কথা হলো, এসব ঘটনাকে আমরা কীভাবে দেখব? আমরা এটাকে এভাবে বলতে পারি যে, এমন একটি সময় ছিল যখন আপনি আমেরিকার যেকোনো অংশে বসবাস করতে পারতেন, এমনকী ট্রাম্পের জামানার একটি পর্যায়েও। তবে কেবল এটুকু অস্বীকার করার বাকি রইল যে, আর কত বেশি খারাপ সময় আসতে পারে।

এই তো মাত্র গত সপ্তাহেই হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে ঘটল কুখ্যাত একটি ঘটনা। আমেরিকান চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়দের জন্য ট্রাম্প আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন হোয়াইট হাউসে। তিনি তিন হাজার ডলার মূল্যের হাম বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং আরো কিছু ফাস্ট-ফুডের ব্যবস্থা করেন খেলোয়াড়দের জন্য। আর এসব খাবার আনা হয় ম্যাকডোনাল্ড, ওয়েনডি আর বার্গার কিং থেকে। যে কারো মনে প্রশ্ন উঠতে পারে— কেন হোয়াইট হাউসের নিজস্ব বিশেষ মেন্যু নেই? কেন দ্বারস্থ হতে হলো ওইসব ফাস্ট-ফুড কোম্পানির কাছে। এর কারণ অবশ্য সবাই জানেন। সবাই বুঝতে পারছেন কেমন চলছে ট্রাম্পের আমেরিকা।

বস্তুত, আমি এই দৃশ্যকল্প স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম যে, ঐতিহাসিক হোয়াইট হাউসের অন্দরে       প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি বিশাল টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সারি সারি খেলোয়াড়, যাদের সামনে স্বর্ণ-রৌপ্যের থালা-চামচের ভেতরে গাদা করে সাজানো আছে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। ওই বিস্বাদ শীতল বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই যেন ফিসফিস করে বলে দিচ্ছে আমেরিকার অবস্থা এখন কেমন। আপনি একটুখানি ভেবে দেখুন—জ্যাকি এবং জন এফ কেনেডির মতো আমেরিকার সর্বকালের সেরা আইকনের সময় রাষ্ট্রীয় আপ্যায়ন-অভিবাদনের ইভেন্টগুলো কেমন হতো আর এখন কেমন হচ্ছে।

ওপরের ঘটনাটি বলে দিচ্ছে আমেরিকার অবস্থা সত্যিই কতখানি হতাশাজনক। যতটুকু বলা হচ্ছে, অবস্থা সম্ভবত তার চাইতেও বেশি বাজে। কিন্তু কেন হোয়াইট হাউসকে ম্যাগডোনাল্ডের খাবার পরিবেশন করতে হলো? শক্তি, টাকা আর গরিমার তো কোনো অভাব নেই আমেরিকার। কিন্তু ওই ঘটনার সময়ই আমেরিকান সরকার পার করেছে সবচাইতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা। এর অর্থ হলো, হোয়াইট হাউসের নিজস্ব হেঁশেলখানায় কোনো কর্মী ছিল না। এমনকী ছিল না কোনো পরিবেশন-কর্মী। কেবল তাই নয়, ম্যাকডোনাল্ডের খাবারের তিন হাজার ডলার বিলও মেটাতে হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই।    

আমি এটা বোঝাতে পারব না যে, একজন বাংলাদেশি হয়ে এমন ঘটনা শোনাটা আমার জন্য কতখানি অবিশ্বাস্য ছিল। কর্মীহীন আমেরিকার হোয়াইট হাউস কিনা তার বিশিষ্ট অতিথিদের পরিবেশন করছে ঠান্ডা হাম বার্গার! যদিও অচলাবস্থার এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির পর ট্রাম্প একরকম স্বীকার করে নিয়েছেন যে, অচলাবস্থা শুরুর আগে তার প্রশাসন অনুধাবন করতে পারেনি পরিস্থিতি এতখানি বাজে হবে; বিশেষ করে ওয়াশিংটন ডিসিতে, যেখানে রয়েছে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ফেডারেল কর্মীদের কর্ম ও আবাসস্থল।

এই অচলাবস্থার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিমানবন্দর ও সীমান্তে আমেরিকার নিরাপত্তা কর্মীদের অবস্থা। এই সময় তারাও কোনো বেতন পাননি। ট্রাম্প মনে করছেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল দিলে তার আমেরিকার নিরাপদ থাকবে। অথচ সেই দেয়াল নির্মাণের অর্থ বরাদ্দ করতে না পেরে তিনি পুরো আমেরিকার নিরাপত্তাই আলগা করে দিলেন! এমনকী এফবিআই এবং সিআইএ—আমেরিকার প্রধান গোয়েন্দা সংস্থাও এই অচলাবস্থার সময়ে ছিল বেতনশূন্য!    

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন যে, তিনি যেভাবে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলে আমেরিকাকেও তিনি সেভাবে পরিচালিত করবেন। তার সমর্থকরা তখন ভেবেছিলেন যে, এটা ট্রাম্পের চমত্কার একটি আইডিয়া। কিন্তু সেটা যে কতখানি ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটা আমেরিকানরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। আসলে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অচলাবস্থার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ট্রাম্প তার অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দশকে অচল করে দিয়েছেন। ট্রাম্প এয়ারলাইন্স, ট্রাম্প স্টিকস, ট্রাম্প ভোদকা, ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি, ট্রাম্প ফাউন্ডেশন, ট্রাম্প ক্যাসিনো প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে কর্মীদের বেতন আটকে দিয়ে এবং ব্যবসা বন্ধ করে অনেক আগেই প্রমাণ করেছেন তিনি কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারেন। 

একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রাশিয়া আর পুতিন ছাড়া আমেরিকার এই পাঁচ সপ্তাহের অচলাবস্থায় কেউই খুশি হয়নি। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলমান এফবিআই-এর তদন্তে ব্যাঘাত ঘটেছে এই অচলাবস্থার জন্য। দৃশ্যত মনে হচ্ছে, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থ তহবিলের সংকট কাটলেও সম্ভবত আরো নতুন নতুন সংকট অপেক্ষা করছে আমেরিকার জন্য।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : তাপস কুমার

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ