নতুনদের বুকে টেনে নিন

আরাফাত শাহীন

ইতোমধ্যে দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং কোনো কোনো জায়গায় ক্লাসও আরম্ভ হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী অনেক স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। প্রথম যখন কোনো শিক্ষার্থী এমন একটা বড় জায়গায় নিজের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে তখন স্বভাবতই তার মধ্যে অন্যরকম একটা আবেগ ও উত্তেজনা কাজ করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই তার সমস্ত কাজ শেষ হয়ে যায় না। এখানে এসে তাকে পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেও নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করে তখন তাকে ভর্তি পরীক্ষার মতো এখানে এসেও নানামুখী পরীক্ষা এবং প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভয়ঙ্করভাবে র্যাগিং সিস্টেমটা চালু আছে। অনেকে একে নতুনদের সঙ্গে পরিচিত হবার মাধ্যম মনে করেন এবং অনেক বড়ভাই এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে জঘন্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন। দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে র্যাগিং অবশ্যই একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ। এটি একপ্রকার মানসিক নির্যাতন যা করে একটা শ্রেণির মানুষ পৈশাচিক তৃপ্তি পেয়ে থাকে। একজন নবীন শিক্ষার্থী যখন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় তখন স্বভাবতই তার ওপর মানসিক চাপ পড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তার মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণার জন্ম হতে পারে।

র্যাগিংয়ের মতো অপরাধ বন্ধ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, এতে এই অপরাধ পূর্বের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। তবে আমরা নিজেরা যদি সচেতন না হই এবং এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে না পারি তাহলে কিছুতেই র্যাগিং বন্ধ করা যাবে না। সবার আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, নতুন যে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করল সে আমাদেরই ভাই কিংবা বোন। বাড়িতে আমরা যেমন নিজেদের ভাই-বোনকে আগলে রাখি এখানেও তাদের সেভাবে আগলে রাখতে হবে। আজ যদি আমি অন্যের ভাই-বোনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করি তাহলে আগামীতে যখন আমার নিজের পরিবারের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করবে, তখন তার সঙ্গে অন্য কেউ খারাপ আচরণ করবে না তার নিশ্চয়তা কী?

একজন শিক্ষার্থী যখন অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে, তখন এখানে এসে সে নিজেকে নিঃসঙ্গ বোধ করে। কারণ একেবারে অপরিচিত এক পরিবেশে এসে হঠাত্ করেই সবাই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না। বন্ধু-বান্ধবহীন নিঃসঙ্গ অবস্থায় সে যেন নিজেকে একা না ভাবে সে জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী নতুন নতুন এসে থাকার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই পর্যাপ্ত পরিমাণ আবাসনের ব্যবস্থা নেই। সুতরাং এমন সমস্যার উত্পত্তি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমরা যারা এখানে পরিচিত হয়ে গিয়েছি তাদের উচিত হবে এসব শিক্ষার্থীকে থাকার মতো জায়গা জোগাড় করে দেওয়া। এটাই প্রকৃতপক্ষে সমাজসেবা এবং দেশের জন্য কাজ করা।

স্কুল-কলেজের শিক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা ক্লাসে শিক্ষকদের লেকচার ঠিকমতো বুঝতে পারে না। ফলে তারা মনোযোগ হারিয়ে ফেলে এবং যার ফলশ্রুতিতে রেজাল্ট খারাপ হয়ে যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ক্লাসে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষককে প্রশ্ন করে বিষয়টা বুঝে নিতে হবে। তা ছাড়া ক্লাসের বড়ভাইদের কাছ থেকেও এ ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। যেসব ছোটভাই আপনাদের কাছে পরামর্শের জন্য আসবে তাদের সুন্দর পরামর্শের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার পথ দেখিয়ে দেবেন। এতে করে আপনাদের প্রতি নতুনদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বহুগুণ বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

শিক্ষকদের উচিত হবে নতুন শিক্ষর্থীদের জন্য সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা। একটি সুস্থ ও সুন্দর জাতি গঠন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সুতরাং তাদের সেভাবেই গড়ে তোলা কর্তব্য। নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা সকল শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর জন্য একান্ত প্রয়োজন।

n লেখক:শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়