প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চিকিত্সক ও নার্সদের নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করুন, নতুবা চাকরি ছাড়ুন। যে ডাক্তার জেলায় যাবেন না তার দরকার নেই। চিকিত্সকদের সেখানে বদলি করা হবে, তারা যদি সেখানে কাজ না করে তাহলে তাদের ওএসডি করে রেখে দিতে হবে। নতুন ডাক্তার নিয়োগ দিতে হবে। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তাত্ক্ষণিক ওএসডি করারও নির্দেশনা দেন তিনি।
টানা তৃতীয় বারসহ মোট চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল রবিবার সকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের ডাক্তাররা সবসময় প্রাইভেট চিকিত্সা দিতেই পছন্দ করে। পৃথিবীর বহু দেশ আছে, সরকারি চাকরি যতদিন করে, ততদিন কিন্তু প্রাইভেট চাকরি করতে পারে না। এমনকি সিঙ্গাপুরেও যাবেন, এনইউএইচের ডাক্তাররা প্রাইভেট চিকিত্সা করতে গেলে ওই হাসপাতালের মধ্যেই আলাদা ব্যবস্থা আছে। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিঃবিভাগে এ ধরনের একটি ব্যবস্থা চালু থাকার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এটা কিন্তু আমরা অন্যান্য জেলা হাসপাতালেও করে দিতে পারি, যেন তাদের বাইরে না যেতে হয়। সন্ধ্যার পরে বা ছুটির সময় ওখানেই একটা প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা বা আলাদা একটা উইং করে দেওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী দেখার পরে প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে কেউ রাত ১২টা, ১টা, ২টা পর্যন্তও নাকি অপারেশন করে। যে ডাক্তার রাতভর অপারেশন করবে, সে আবার সকাল ৮টার সময় এসে রোগী দেখবে কী করে? তার মেজাজটাতো এমনিই খিটখিটে থাকবে। এটা যেন না হয় সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হবে।
কোন জেলার কোন উপজেলার জন্য হাসপাতাল লাগবে, তা কত শয্যার হতে হবে, চিকিত্সক, নার্স ও অন্যান্য কি সুবিধাদি প্রয়োজন তা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে একটি জরিপ করে দেখতে হবে। সে অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে, এর আগে জরিপ করে দেখতে হবে হাসপাতালগুলোতে কত রোগী যাচ্ছেন? কতজন এটেনডেন্ট রয়েছেন? ডাক্তাররা সেখানে থাকছেন না কেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের সেখানে বদলি করা হচ্ছে তাদের কর্মস্থলে যেতে হবে।
চিকিত্সার জন্য রেফারেল সিস্টেম চালুসহ দেশে প্রথম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) প্রতিষ্ঠার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকটি হাসপাতালেই অনলাইন রেফারেল সিস্টেম চালু করতে হবে। তার সরকার দেশে চিকিত্সকের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে এবং নার্সদের প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ সময় তিনি নার্সদের পেশাকে দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত করার প্রসঙ্গ তুলে ধরে রোগীদের সেবার বিষয়ে তাদের আরো আন্তরিক হওয়ার নির্দেশ দেন। নার্সদের ভালোভাবে দায়িত্ব পালন না করার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের তো রোগীদের সেবা দিতে হবে। সেজন্যই আমরা তাদের পদমর্যাদা এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছি। রোগীদের সেবা না দিলে ঐ দ্বিতীয় শ্রেণির নার্সদের দরকার নাই। আমার পরিষ্কার কথা, আমি তাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছি কারণ, রোগী যেন সেবা পায়। তিনি বলেন, নার্সদের মাঝে মানসিকতা আছে যে তারা যেহেতু দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে উন্নীত হয়েছেন, তাই তারা রোগীদের সেবা দেবেন না। না, এটা হবে না। তাদের অবশ্যই (রোগীদের) সেবা দিতে হবে, আমরা তাদের এত সম্মান দিয়েছি যাতে তারা সেবা দেন। একজন নার্সের কাজ কিন্তু শুধু ওষুধ খাওয়ানো নয় বরং পাশ্চাত্যে নার্সরাই রোগীর সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে রোগী সম্পর্কে সার্বিক রিপোর্ট তৈরি করে ডাক্তারকে দেখায়, ডাক্তার সেই রিপোর্ট দেখে, চিকিত্সা দেয় এবং রোগীর সার্বিক সেবা করাটাই নার্সদের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘নার্সদের আমি সম্মান দিয়েছি ঠিক; কিন্তু রোগীর সেবাটা করতে হবে, এটা বাধ্যতামূলক, না করলে তারা কাজে থাকবে না, চলে যাবে। আমরা নতুন লোক প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসবো।’ তিনি এসময় চিকিত্সকদের ইন্টার্নশিপ দুই বছর করে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এক বছর তারা থাকবে যে প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানে এবং আর একটি বছর তাদের যুক্ত থাকতে হবে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে।
মিডওয়াইফ প্রশিক্ষণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের গ্রাম-গঞ্জে এটা চালু আছে, দাই বলে যাদেরকে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। যাতে কেউ চাইলে ঘরে বসে ডেলিভারির (সন্তান প্রসব) কাজটা করতে পারে।’ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাক্তার এবং নার্স এবং বিশেষ করে ডাক্তার না থাকার অনবরত অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এজন্য প্রত্যেকটি হাসপাতালে অনুপস্থিতির বিষয়টি তদারকির জন্য বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থাটাও চালু করতে হবে।’
চিকিত্সা ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল অটোমেশন পদ্ধতি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘তাহলে এক্ষেত্রে একটা জাবাবদিহিতা থাকবে এবং অপচয় রোধ হবে এবং যেটা প্রয়োজন শুধু সেটাই ক্রয় করা হবে, যেটা না হলেও চলে সেটা আর ক্রয় করা হবে না।’ তিনি এ সময় সঠিক মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, এটা (বর্জ্য) নাকি সিটি করপোরেশনকে দিয়ে দেয়। সিটি করপোরেশন এটা নিয়ে কি করল তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। এটা হলো একটা বাস্তব অবস্থা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. জাহিদ মালিক এবং প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।