করোনা মহামারির প্রভাবে বিশ্ব এখন টালমাটাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে মহাসংকটে ফেলেছে এই জীবনঘাতী রোগ। পৃথিবী জুড়ে ২৩০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চল এখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। এর প্রকোপে মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি টিকা প্রদান কর্মসূচি সম্প্রসারিত হলেও রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি এখনো। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাসটি এর প্রকৃতি পালটাচ্ছে। কোথাও আরো ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। দ্রুত আক্রান্ত করছে অসহায় মানবজাতিকে। পৃথিবীর অনেক দেশ করোনা ঠেকাতে এখনো পুরো বা আংশিক লকডাউনে আছে। তাতে গৃহবন্দি বা এলাকাবন্দি অবস্থায় জীবন যাপন করছে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ। করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর জীবিকার ধান্দায় লকডাউন শিথিল করা হলেও পরিস্থিতি অবনতির কারণে ফের লকডাউনে চলে গেছে ফ্রান্সসহ আরো অনেক দেশ। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। গত সোমবার ৫ এপ্রিল থেকে এখানেও শুরু হয়েছে লকডাউন। প্রাথমিকভাবে এর মেয়াদ এক সপ্তাহ। শেষের দিকে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। মৃত্যুর হারও আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তাই ফের এই লকডাউন।
লকডাউন স্বাস্থ্যনিরাপত্তার জন্য সাময়িকভাবে প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন জীবিকার জন্য ক্ষতিকর। তাতে মানুষের কর্মসংস্থান বিঘ্নিত হয়। আয় হ্রাস পায়। উত্পাদন স্থবির হয়ে যায়। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে খাদ্যনিরাপত্তা। এর ফলে দারিদ্র্য বেড়ে যায়। এর বিপরীতে অসচ্ছল নাগরিকদের জন্য যত বেশি ত্রাণ ও সহায়তা দেওয়া দরকার তা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে এবারের লকডাউন অনেকটাই শিথিল। শিল্পকারখানা, জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, পণ্যবাহী পরিবহন ও কাঁচাবাজার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে লকডাউনের। সীমিত পরিসরে অফিস-আদালতও চলছে। রাজপথে গণপরিবহন না থাকলেও প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, রিকশা সবই চলেছ। তাতে যাতায়াতও করছে অনেক মানুষ। গ্রামগুলোতে লকডাউনের প্রভাব খুবই কম। হাটবাজার, দোকানপাট স্বাভাবিকভাবেই চলছে। সকাল-সন্ধ্যায় মাঠে কাজ করছেন গ্রামের কৃষক। তবে শহর ছেড়ে গ্রামমুখী মানুষের অভিগমন এখন চোখে পড়ার মতো। এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সংক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
কৃষির উত্পাদনে স্বল্পমেয়াদি লকডাউনের প্রভাব খুবই কম। দীর্ঘ মেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হতে পারে কৃষিপণ্য বিপণনের ওপর। এখন বোরো ধান উত্পাদনের সময়। চালের বাজারে চাঙ্গা ভাব থাকায় এবার বোরো চাষের এলাকা সম্প্রসারিত হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ঐ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ মৌসুমে ধান আবাদ করা হয়েছে ৮৩ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে। হাইব্রিড ধানের আবাদ বেড়েছে। এবার বোরো চালের মোট উত্পাদন হবে প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ টন। হাওর এলাকায় ইতিমধ্যেই আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সমতলেও বিআর ২৮ জাতের ধান কাটা শুরু হবে। লকডাউন দীর্ঘায়িত না হলে ধান কাটার শ্রমিক চলাচলে তেমন কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হবে না। তাছাড়া বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে হাওর ও পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে শ্রমিক জোগানের ব্যবস্থা নেওয়া হলে ধান কাটা ও মাড়াই করার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবে না। বর্তমানে দেশে ধান কাটার ক্ষেত্রে যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। হাওরে ও সমতলে এখন ৬০ শতাংশেরও বেশি ধান কাটা হয় রিপার ও কমবাইন্ড হার্ভেস্টার দিয়ে। এখন ভর্তুকির মাধ্যমে ধানকাটা যন্ত্রের ক্রয় বেড়েছে। মাঠে এর ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে এবারের সাময়িক লকডাউন বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি করবে না।
তবে লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে ধান বিক্রির ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হবেন কৃষকগণ। পরিবহন সংকট ও ক্রেতার অভাবে ধানের দাম নিচে নেমে যাবে। কৃষকের উত্পাদন খরচও তাতে মেটানো যাবে না। এক্ষেত্রে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে সরকার। সাধারণত মে মাসের মধ্যভাগ থেকে বোরো ধান-চাল সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি থাকে সরকারিভাবে। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে মে মাসের শেষ সপ্তাহেও তা শুরু করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। যে কারণে এপ্রিলের মধ্যভাগ থেকেই ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে যাতে কৃষকের কাছ থেকে তা কেনা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। উত্পাদন খরচের ওপর কমপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা যোগ করে নির্ধারণ করতে হবে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য। এটি নিশ্চল না রেখে আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং অভ্যন্তরীণ বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে নির্ধারণের ও পরিবর্তনের বিধান করতে হবে। নতুবা সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল হবে না। গত বোরো মৌসুমে ১৫ লাখ টন চাল ও ৬ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর গত আমন মৌসুমে ৬.৫ লাখ টন চাল ও ২ লাখ টন ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষে কোনো মৌসুমেই লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক পরিমাণ ধান-চালও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
করোনার ভয়াবহ সংক্রমণ ও তজ্জনিত লকডাউনের একটি নেতিবাচক প্রভাব হলো খাদ্যশস্যের উত্পাদন হ্রাস ও বিশ্ববাজারে এর মূল্যবৃদ্ধি। বাংলাদেশেও এর প্রভাব কিছুটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে এবার বোরো ধান উত্পাদনের পূর্বাভাস ভালো। সারা দেশেই বোরোর উত্পাদন আশানুরূপ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকারের মজুত ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় অচিরেই চালের বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে ধারণা করা যায়। আলুর বাজারদর ইতিমধ্যেই অনেক কমে গেছে। পেঁয়াজের বাজারও স্থিতিশীল। তেল, ডাল ও চিনির জন্য আমরা অনেকটাই আমদানিনির্ভর। দাম কিছুটা বেশি। লকডাউনের প্রভাবে এসব পণ্যের সরবরাহে তেমন কোনো সংকট সৃষ্টি হবে বলে মনে হয় না। তবে এক্ষেত্রে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের অশুভ চক্রান্তের দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে হবে। এদের অন্যায্য মুনাফার রাশ টেনে ধরতে হবে।
শাকসবজি, ফলমূল, দুধ, ডিম, মাংস ও মাছের বাজারজাতকরণে লকডাউনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। গত বছর লকডাউনের সময় আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। শাকসবজির উত্পাদন ভালো ছিল বলে প্রয়োজনীয় ক্রেতার অভাবে ও পরিবহন সংকটের কারণে খামারপ্রান্তে কৃষকরা উত্পাদন খরচের সিকিভাগও হাতে নিতে পারেনি। পোলট্রি উপখাতে চাহিদা হ্রাসের কারণে ডিম ও ব্রয়লারের দাম অনেক কমে গিয়েছিল। মোট উত্পাদনের অর্ধেকও বাজারে বিক্রি করা যায়নি। ডিমের উত্পাদন খরচ প্রতিটি পাঁচ টাকা। বিক্রি হয়েছে চার টাকারও কম। ব্রয়লারের উত্পাদন খরচ প্রতি কেজি ৯৫ টাকা। বিক্রি হয়েছে ক্ষেত্রবিশেষে ৬০/৭০ টাকা কেজি। মুরগির এক দিনের বাচ্চা উত্পাদনে খরচ পড়েছে প্রতিটি ৩৫ টাকা। বিক্রি হয়নি এক টাকা দামেও। অনেকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছে মুরগির বাচ্চা। তরল দুধের দাম যেখানে ছিল প্রতি লিটার ৫০ থেকে ৬০ টাকা, সেখানে তা বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। তার পরও ক্রেতা ছিল না দুধের জন্য। মিষ্টির দোকানগুলো বন্ধ থাকায় এবং দুগ্ধ বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নিয়োজিত শিল্পগুলো দুগ্ধ ক্রয় কমিয়ে দেওয়ায় কৃষকরা উত্পাদিত তরল দুধের অর্ধেকও বিক্রি করতে পারেনি। জীবন্ত গরু, খাসি ও কাটা মাংস বিক্রি নেমে গিয়েছিল সিকিভাগে। মত্স্য উত্পাদনেও বিরাজ করছিল দারুণ চাহিদাসংকট। মত্স্য অবতরণ কেন্দ্রগুলো ছিল প্রায় ক্রেতাশূন্য। তবে সরকারের হস্তক্ষেপে কৃষিপণ্যের বিক্রি কিছুটা ত্বরান্বিত হয়। এবারে সেই পুরোনো সমস্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে হয় না। কারণ গত বছরের লকডাউন থেকে সরকার, উত্পাদনকারী কৃষক ও ভোক্তাগণ শিক্ষা নিয়েছেন। অতএব, এ বছর সমস্যাগুলো সমাধান সহজ ও দ্রুততর হবে।
লকডাউনকালে খামারপ্রান্তে পরিবহন ও ক্রেতার সংকট এবং শহরাঞ্চলে চাহিদা হ্রাস কৃষকের উত্পাদিত পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা। তাতে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হন দেশের কৃষকরা। সেজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ফরিয়াদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে হবে। কৃষিপণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক ও ভ্যানের যাতায়াতও নির্বিঘ্ন করতে হবে। বিআরটিসির ট্রাক ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। পার্সেল ট্রেনে কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং হিমায়িত ওয়াগন ব্যবহার করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। ইতিমধ্যেই দেশে যাত্রা শুরু করেছে খাদ্যশস্য ও কৃষিপণ্য বিপণনে উন্মুক্ত মার্কেট প্লেস ‘ফুড ফর নেশন’। এটি কৃষিপণ্য বিপণনে ডিজিটাল ও ওপেন প্ল্যাটফরম হিসেবে কাজ করছে। এর আওতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাছাড়া ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকার কর্তৃক পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ বিপণন ব্যবহার স্থায়ীরূপ নিশ্চিত করতে হবে। সরা দেশে এখন লকডাউন চলছে। জীবনের ভয়ে ঘরে বসে দিনযাপন করছেন শহরের অনেক মানুষ। কিন্তু করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক উপেক্ষা করে এখনো মাঠে নামছেন গ্রামের কৃষকগণ। তারা পাকা ধান কেটে ঘরে তুলে আনছেন। নিয়মিত ফসলের পরিচর্যা করছেন। তাছাড়া পোলট্রি ও মত্স্য খামারে তারা খাবার সরবরাহ করছেন। গাভির দুধ দোহন করছেন। গরুতে ঘানি টানছেন। সামনে আসছে পাট ও আউশ ধান বোনার সময়। এর জন্য সংগ্রহ করতে হবে বীজ ও সার। নিশ্চিত করতে হবে টাকার জোগান। এরপর আসবে রোপা আমন, ভুট্টা ও সবজি আবাদের সময়। তাতেও লাগবে অনেক টাকা। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বৃদ্ধি পাবে কৃষিপণ্যের উত্পাদন খরচ। অথচ বাজারজাতকরণে সমস্যাহেতু কৃষি ব্যবসায়ে লোকসান গুনতে হবে দেশের কৃষকদের। ফলে উত্পাদনে নিরুত্সাহিত হবেন অনেক কৃষক। বিঘ্নিত হবে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা। এই পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি খাতের জন্য বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। গত বছর কৃষি খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছিল। এর বাস্তবায়নের সময় বারবার বৃদ্ধি করা সত্ত্বেও বছর শেষে ঐ প্রণোদনা ৭৫ শতাংশের বেশি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ কথাটি মনে রাখতে হবে।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে আমরা উভয় সংকটে পড়েছি। যেমন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। একদিকে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি, অন্যদিকে আর্থিক স্থবিরতা। আমরা স্বাস্থ্যের সুরক্ষা চাই।
আর্থিক খাতেরও সচল অবস্থান চাই। সে কারণে অতি দ্রুত লকডাউন শিথিল করতে হবে। সম্ভব হলে লকডাউন শব্দটি তুলে নিতে হবে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের করতে হবে করোনার সঙ্গে সহাবস্থান। বেছে নিতে হবে অভিযোজন বা খাপ খাওয়ানের পথ। এতে সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।
n লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ, উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ। প্রাক্তন মহাপরিচালক,
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট।