দেশের মফস্বল অঞ্চলে চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিবার বিষয়টি নূতন নহে। ইহার পূর্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হইতে বহুবার কড়া নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। বিসিএসের মাধ্যমে নূতনভাবে যাহারা নিয়োগ লাভ করিতেছেন, তাহাদের প্রথম কয়েক বত্সর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে বাধ্যতামূলকভাবে পোস্টিং দেওয়া হইতেছে। এত সব হুঁশিয়ারি ও ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও দেখা যাইতেছে একশ্রেণির চিকিত্সক মফস্বল পর্যায়ে থাকিয়া চিকিত্সাসেবা দিতে অনিচ্ছুক। ইহাতে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সাসেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছে। এই ব্যাপারে স্ব-স্ব এলাকার এমপিদের দৃঢ় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়ার পরও কার্যত কোনো ফল হইতেছে না। এমতাবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরও হার্ডলাইনে যাইতে বাধ্য হইলেন। গত রবিবার তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন। এই সময় তিনি কোনো চিকিত্সক কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত না থাকিলে সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে ওএসডি করিবার নির্দেশ দিয়াছেন। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করিতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করিবার নির্দেশ জারি করিয়াছেন।
প্রধানমন্ত্রী ইহার আগে সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকদের উদ্দেশে বহুবার বলিয়াছেন যে, যাহারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিবে তাহাদের সরকারি চাকুরি করিবার প্রয়োজন নাই। কেননা তাহাদের নিয়োগপত্রে এমন কোনো কথা লিখা নাই যে, তাহাদের মফস্বলে কাজ করিতে হইবে না। যাহারা সেখানে থাকিতে চাহেন না, তাহারা সরকারি নিয়ম ও আদেশ লঙ্ঘনকারী। সরকার তাহাদের দয়াপরবশ হইয়া চাকুরিতে বহাল রাখিয়াছে, ইহাই কি যথেষ্ট নহে? পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে যে, এই ব্যাপারে কঠোর হইবার পাশাপাশি নজরদারি বৃদ্ধিরও কোনো বিকল্প নাই। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক প্রমাণ পাইয়াছে যে, রাজধানী ঢাকার বাহিরের হাসপাতালগুলিতে ৬২ শতাংশ চিকিত্সক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। সম্প্রতি একযোগে দেশের আটটি জেলার ১১টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অভিযান চালাইয়া তাহারা হাতেনাতে ইহার প্রমাণ পান।
স্বাস্থ্যখাতে এই অনিয়ম ও অবক্ষয় অত্যন্ত দুঃখজনক। রোগীদের হয়রানি ও ভোগান্তি বন্ধ করিতে হইলে এই ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়। মফস্বল এলাকায় বর্তমানে বিদ্যুত্, মোবাইল নেটওয়ার্ক, পানি, গ্যাস, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি নানা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছাইয়া গিয়াছে। তাহার পরও চিকিত্সকরা কেন গ্রামে থাকিবেন না? তাহার একটাই কারণ, বড় বড় শহরে আসিয়া প্রাইভেট প্র্যাকটিসের মাধ্যমে অবারিত অর্থোপার্জনের সুযোগ গ্রহণ যাহা গ্রাম বা মফস্বল অঞ্চলে সম্ভব নহে। আরেকটি প্রধান কারণ নারী চিকিত্সকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। তাহাদের অনেকের পক্ষে মফস্বল এলাকায় দায়িত্ব পালন করা বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠিন। এই বিষয়টিও নূতন করিয়া ভাবিতে হইবে। আছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণসহ আরও কিছু যৌক্তিক কারণও। আবার বড় বড় শহরে থাকিবার জন্য একশ্রেণির চিকিত্সক স্বাস্থ্যপ্রশাসনের যোগসাজশে যে সিন্ডিকেট গড়িয়া তুলিয়াছে, তাহাও ভাঙিতে হইবে। ইন্টার্নশিপ দুই বত্সর করা ও এক বত্সর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে সম্পন্ন করিবার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপের বিষয়টি ইতিবাচক। বিভাগীয় শহরে বড় বড় হাসপাতাল নির্মাণ, গ্রামে-গঞ্জে চিকিত্সা সুবিধা ও চিকিত্সকদের জন্য নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ও বিবেচনায় রাখিতে হইবে।