দেশব্যাপী উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যেন আত্মহত্যার উত্সব চলছে। আত্মহত্যা যদিও একটা সামাজিক ব্যাধি; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা অন্য পাঁচটা আত্মহত্যার চেয়ে মর্মান্তিক। যেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ হয়, সেইসব স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে এসেও কেন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করবে—জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় অর্জিত জ্ঞান শুধু জ্ঞানই নয়; অর্জিত জ্ঞানের স্বকীয়তা বজায় থাকে, যার মাধ্যমে মানুষের মনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একের পর এক আত্মহত্যা তাদের অমূল্য জীবনের মূল্য নির্ধারণে অনুদারতার পরিচয়; যা দেশের মানুষকে বিব্রত, শঙ্কিত, আতঙ্কিত করছে। অনেক স্বপ্নময় জীবনের আশা নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অসীম সম্ভাবনার মধ্যে দাঁড়িয়েও শিক্ষার্থীরা কেন এবং কোন্ যুক্তিতে আত্মহত্যা করছে বিষয়গুলো অবশ্যই ভেবে দেখা দরকার।
সমপ্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী প্রতীকের আত্মহননের মাধ্যমে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক নিয়োগে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান শক্তির প্রভাব বিস্তার জাতির সামনে কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবারের ভাষ্যমতে, অনার্সে প্রথম হওয়া ছেলেটিকে মাস্টার্সে নাম্বার কমিয়ে দেওয়ার অর্থ তাকে বাদ দিয়ে শিক্ষকদের পছন্দের অন্য কাউকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নভঙ্গের হতাশা থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় প্রতীক। ঠিক একইভাবে গতবছর পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া দেবাশীষ মন্ডল নামে আরো একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। চাকরি পাওয়ার শর্তে কর্তৃপক্ষের ঘুষের আবদার পূরণে ১৫ লাখ টাকা জোগাড় করেও শেষের দিকে অদৃশ্য সুতার টানে সব আটকে যায়। স্বপ্নভঙ্গের হতাশায় রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় দেবাশীষ মন্ডল।
পরিবার এবং সমাজের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা, প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্ষীয়মাণ সুযোগ তাদের বিষণ্নতাকে হতাশায়, হতাশাকে ভয় আর ভয় ভবিষ্যেক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। প্রত্যেকটা আত্মহত্যার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে আমাদের অসচেতন পরিবারগুলো। প্রেমবিষয়ক জটিলতা, প্রত্যাশিত চাকরি না পাওয়ার আক্ষেপ, অন্যান্য যেকোনো সমস্যায় একজন মানুষ যখন ব্যর্থ হয় তখন সে পরিবারের উপর পুরো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাইরের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে তাকে তার পরিবার সাহায্য করবে, তাকে মনোবল জুগিয়ে মন শক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিবে এই আশায় থাকে। কিন্তু যখন পরিবার তাকে আরো অবহেলা করে, বিপরীত কথা শোনায় তখন সে আর তা সহ্য করতে পারে না। সে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করে। নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করে সে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আমাদের প্রত্যেকটা পরিবারে অন্তত এমন একজন সদস্য থাকা উচিত যাকে নিঃসঙ্কোচে সবকিছু বলা যায়। পুরো পৃথিবী বিপক্ষে দাঁড়ালেও অন্তত পরিবার পাশে দাঁড়াবে, এমন ভরসা থাকা খুব দরকার।
আমরা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে যতোই অগ্রসর হচ্ছি আমাদের মাঝে প্রতিযোগিতার মনোভাব ততোই বাড়ছে। আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন কমতে শুরু করেছে। এতে করে আমাদের নিজেদের সমস্যাগুলো একে অন্যকে মন খুলে বলতে পারছি না। ফলে একপ্রকার হতাশা থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা জাগে। একজন আত্মহত্যা করলে আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা একই ধরনের সমস্যার জন্য আত্মহত্যাকে সমাধান হিসেবে বেছে নেয়। যার কারণে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে ।
আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান নয়। জীবন আপনার। আপনি আপনার জীবন রাখবেন কি রাখবেন না তা একান্তই আপনার ব্যাপার; তর্কের খাতিরে এটি মেনে নিলাম। কিন্তু আপনার জীবনের সঙ্গে যদি আরো কিছু জীবন জড়িয়ে থাকে, তাহলে আপনার জীবনের মালিকানা শুধুমাত্র আপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কাজেই চাইলেও আপনি আত্মহনন করতে পারেন না। কেননা, আপনার একটি অপমৃত্যু আরো কিছু মানুষকে জিন্দালাশে পরিণত করবে, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। কাজেই আত্মহত্যা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।
আপনি যদি সফল হতে চান, তাহলে আপনার জন্য সম্ভাবনাময় অনেক পথ খোলা আছে। কোনো বিশেষ চাকরি, পেশা বা ভালো ফলাফলকে নিজের সফলতার গন্তব্য ভাবা কোনো সুবিবেচকের কাজ নয়। জীবনে অনেকবার আপনাকে থেমে যেতে হবে, অনেক স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটবে, বারবার হেরে যাওয়ার পরেও নতুন স্বপ্ন দেখতে হবে, আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে কারণ শেষ হাসিটা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
সর্বোপরি, আপনাকে আশাবাদী হতে হবে। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে—দুঃখ উপেক্ষা করে সুখ আসবেই।
n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়