আমাদের ‘সারেং বৌ’ কিংবা পার্বতী

অফিসে বসে গত পরশু ফেসবুকে সারাহ বেগম কবরীর ছেলে শাকের চিশতীর একটি ভিডিও বার্তা দেখছিলাম। খবরের প্রয়োজনে ভিডিও থেকে মূল বক্তব্য নেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভিডিওতে শাকেরের মুখটা দেখে বারবার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। তার মায়ের সুস্থ হয়ে ফেরা কতটা ক্ষীণ, সেটা ছেলের চেহারায় ভেসে থাকা মেঘ জানিয়ে দিয়েছে। তবুও সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল, প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু কবরীর জীবনপ্রদীপ নিভে গেলো। করোনা ভাইরাসের ছোবলে বাংলাদেশে এত বড়মাপের অভিনয়শিল্পীর প্রয়াণ হয়তো এর আগে আমরা দেখিনি। রাতে খবরটা শোনার পরপরই ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেলো! হয়তো অনেকের হৃদয়েও। এরপর বৃষ্টি নামলো মুষলধারে। হয়তো অনেকের চোখেও!  

কবরী কতটা জনপ্রিয় ছিলেন? একটা উদাহরণেই সেটা বোঝা যেতে পারে। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘কখগঘঙ’ ছবির চিত্রায়ন হয়েছিল চুয়াডাঙ্গায়। তখন ‘সেতাব মঞ্জিল’ নামের একটি বাড়িতে উঠেছিলেন কবরী। এজন্য সেই বাড়ির পাশের সড়কের নাম হয়ে গেছে ‘কবরী রোড’। বাড়িটিকে অনেকে ‘কবরী মেস’ নামেও চেনে।

সাংবাদিকতার সুবাদে কয়েকবার কবরীর দেখা পেয়েছি। সমকালের প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারোয়ারের আমন্ত্রণ কিংবা শুভেচ্ছা বার্তা নিয়ে তাঁর গুলশানের বাসায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বেশ স্পষ্টবাদী মানুষ ছিলেন। আর অন্যরকম মমতাময়ী ছিলেন। প্রথমবার তাঁর বাসায় যাওয়ার পর চোখে ভাসছিল ‘সারেং বৌ’ ছবির নবীতুনকে! ছোটবেলায় টিভিতে ‘সারেং বৌ’ দেখেই প্রথম তাঁকে চিনেছিলাম। ছবিটির গল্প সবারই জানা। নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের একটি গ্রামের সহজ সরল মেয়ে নবিতুন। ছবিটিকে বলা যায় নারীর জীবনযুদ্ধের দলিল। ‘সারেং বউ’ উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে নারীর সংগ্রাম। সংগ্রামী নারী নবিতুনের আনন্দ-বেদনা, হতাশা ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টাকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলেন কবরী। তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন একবারই। সেটি ‘সারেং বৌ’ ছবির নবীতুন চরিত্রের জন্যই। ১৯৭৯ সালে চতুর্থ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা, সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীসহ ১০টি পুরস্কার জিতেছিল। ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’র জন্য ববিতা সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়ে যেতেন। কিন্তু কবরী ‘সারেং বৌ’ ছবিতে যা করেছেন, তাতে তাঁকে এই স্বীকৃতি না দিয়ে উপায়ই ছিল না।

‘সারেং বৌ’ ছবির সেই কালজয়ী দৃশ্যের কথা কেইবা ভুলতে পারে! চরে মিঠাপানি না পেয়ে স্তনদুগ্ধ দিয়ে স্বামী সারেং কদমের প্রাণ বাঁচায় নবীতুন। চেতনা ফিরে পেয়ে হাহাকার করে কদম বলে, ‘আমারে পর কইরা দিলি বউ?’ কারণ প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, তাদের মধ্যে আর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থাকেনি। কিন্তু সব প্রতিকূলতাকে জয় করা সাহসী নবিতুন বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে, ‘জান বাঁচানো ফরজ।’ নবীতুন ভেঙে দেয় প্রচলিত ঘুণে ধরা সংস্কারের বেড়াজাল।

শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ বানিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ছবিটিতে মুকুল চৌধুরীর কথা ও আলম খানের সুরে মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে ‘ওরে নীল দরিয়া’ বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ গানের তালিকায় আছে ওপরের সারিতে। গানটির শেষের দিকে কবরীর ঘুম জড়ানো হাসি ভোলা যায়? এমন হাসি আর কোথায় মেলে!

সাহিত্য অবলম্বনে কালজয়ী আরও তিনটি ছবি কবরীকে বাঁচিয়ে রাখবে। এর একটি হলো ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৩ সালে তৈরি হয় এটি। কবরী এই ছবিতে রাজার ঝি চরিত্রে স্মরণীয় অভিনয় করেছেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলামের কালজয়ী ছবি ‘দেবদাস’-এর পার্বতী তথা পারু চরিত্রটি ভুলতে দেবে না কবরীকে। দেবদাসের ভূমিকায় ছিলেন বুলবুল আহমেদ। তাঁর সঙ্গে কবরীর আরেক কালজয়ী ছবি রাজু সিরাজের ‘আরাধনা’ (১৯৭৯)। এতে মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে রুপার ভূমিকায় তাঁর অভিনয় কে ভুলতে পারে! কাজী আনোয়ার হোসেনের গোয়েন্দা চরিত্র নিয়ে বানানো ‘মাসুদ রানা’য় (১৯৭৪) সোহেল রানার বিপরীতে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তিনি।

‘সারেং বৌ’ ছবির সহশিল্পী ফারুকের সঙ্গে কবরীর গ্রামীণ পটভূমিতে অনবদ্য প্রেমের গাঁথা খান আতার ‘সুজন সখী’ বারবার দেখলেও পুরনো মনে হয় না! একই কথা বলা যায় এই ত্রয়ীর ‘দিন যায় কথা থাকে’ (১৯৭৯) এবং ‘আরশীনগর’ (১৯৮৩) ছবির ক্ষেত্রে।

দেশীয় চলচ্চিত্রকে অনেক দিয়ে গেছেন কবরী। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। ক্যামেরার সামনের মতো পেছনেও পরিচালক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন। ‘আয়না’র পর ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সরকারি অনুদানে ‘এই তুমি সেই তুমি’ ছবির শুটিং শেষ করেছেন। বর্ণাঢ্য জীবনে সেলুলয়েড থেকে জাতীয় সংসদে তাঁর পা পড়েছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কোনো চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর সংসদে যাওয়া বাংলাদেশে বিরল।

১৯৬৪ সালের ২৪ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ ছবির মাধ্যমে ‘মিষ্টি হাসির মেয়ে’ তকমা নিজের করে নিয়েছিলেন কবরী। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। সেই কিশোরীর ভুবন ভোলানো মিষ্টি হাসিতে হারিয়ে গিয়েছিল লাখো মানুষ। ছবিটিতে ‘গুন গুন গুন গান গাহিয়া’ গানে সরল গ্রাম্য বালিকার হাসির উদাহরণ আর কেইবা দেখাতে পেরেছেন! চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া মিনা পালকে পর্দায় এনে ‘কবরী’ নামটি দিয়েছিলেন সুভাষ দত্ত। 

‘সুতরাং’ মুক্তির পরের বছর ১৯৬৫ সালের জহির রায়হানের ‘বাহানা’য় অভিনয় করেন কবরী। ওই বছরের ১৬ এপ্রিল মুক্তি পায় উর্দু ছবিটি। পূর্ব বাংলার ইতিহাসে এটি ছিল প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র। এপ্রিল মাস কেনো যেন কবরীর জীবনে অন্যরকম হয়ে থাকলো। তার কালজয়ী তিন ছবি সুভাষ দত্তের ‘আবির্ভাব’ ১৯৬৮ সালের ১২ এপ্রিল, নজরুল ইসলামের ‘দর্পচূর্ণ’ ১৯৭০ সালের ১৭ এপ্রিল এবং আলমগীর কুমকুমের ‘আগুনের আলো’ ১৯৭৮ সালের ২১ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান কবরী। এরপর কলকাতা গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ নিয়েছিল। ১৭ এপ্রিলের প্রথম প্রহরেই তিনি চিরবিদায় নিলেন। কী কাকতালীয়!

১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া আলমগীর কুমকুমের ‘স্মৃতিটুকু থাক’ ছবির নামে ২০১৭ সালে নিজের আত্মজীবনী প্রকাশ করেন কবরী। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশকে কতটা লালন করতেন তিনি, ‘স্মৃতিটুকু থাক’ নামকরণই বলে দেয় সেই কথা। কবরীর সব স্মৃতি থেকে গেলো পর্দায়, মানুষের মনে।

ইত্তেফাক/কেকে