রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যখন অমর একুশে গ্রন্থমেলার স্টল তৈরির কাজ চলছে তখন বাংলাবাজারে চলছে বই ছাপানোর তোড়জোড়। রিকশার লাইন, মানুষের ভিড় ছাপিয়ে প্রেসে কাগজ টানার শব্দই কানে আসছে বেশি। বড় বড় ঝুড়ির ভারে কুলিদের পিঠ নুয়ে পড়েছে। সেই ঝুড়ি উপচে উঠেছে বইয়ে।
পঞ্চাশের দশকেও বাংলাবাজারে বইয়ের দোকান বসেনি, ছিল না কোন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। তখন ভারত থেকে বই আমদানি হতো। বাবুবাজারে ইসলামি বইয়ের কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল। সেই সময়ে গুটি গুটি পায়ে প্রকাশনার কাজ শুরু করা বাংলাবাজার এখন বাংলা বই প্রকাশের অন্যতম কেন্দ্র।
বইয়ের রাজ্য ঢাকার বাংলাবাজারে বছর জুড়েই ব্যস্ততা চোখে পড়ে। তবে বইমেলা উপলক্ষে সেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই তিন মাস তুমুল ব্যস্ততায় আবর্তিত হয় বাংলাবাজার। এই ব্যস্ততা থাকবে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই। কাজের চাপ বেশি থাকায় ছুটির দিনেও কাজ করছেন শ্রমিকরা।
বই ছাপানোর পাশাপাশি বই ভাঁজ করে সেলাই, বাঁধাইও চলছে মেশিনে। এসব মেশিন ঘণ্টায় সাত থেকে আট হাজার পাতা ভাঁজ করতে পারে বলে জানালেন বই বাঁধাইয়ে নিয়োজিত শ্রমিক লক্ষণ সাহা। মেশিনে বাঁধাইয়ে খরচ বেশি। তাই হাতেও তাদের বাঁধাই করতে হয়।
তবে বইমেলার সময় শুধু বাংলাবাজার নয়, পুরানো ঢাকা ছাড়িয়ে বই ছাপানোর কাজ ছড়িয়ে পড়ে আরামবাগ, ফকিরেরপুল, পুরানো পল্টন, নীলক্ষেত— এসব এলাকাতেও।
অবসর প্রকাশনীর প্রকাশক মোঃ আলমগীর রহমান জানালেন, বইমেলা শেষ হওয়ার পর থেকেই পরের বছরের বইমেলার কাজ শুরু হয়ে যায়। আমরা সাধারণত মেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ করি না। তাই সারাবছরই বই প্রকাশ হতে থাকে। এগুলোই বইমেলায় স্থান পায়।
পাঠকরা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন কী বই আসছে বইমেলায়। বাংলাবাজার ঘুরে জানা গেল, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স আবিষ্কার করেছে বাংলা ভাষার সায়েন্স ফিকশনের জনককে। তিনি হলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। বাংলা ভাষায় লেখা সেই প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর নাম ‘পলাতক তুফান’। রয়েছে বেসিক আলী সিরিজের পরবর্তী পর্ব, সেলিনা হোসেনের ‘গল্পের নদীতে খেয়াঘাট’ ও ‘নদীর সঙ্গে গান’ প্রভৃতি। অবসর প্রকাশনী নিয়ে আসছে শিল্পী মুর্তজা বশীরের জীবনালেখ্য ‘নার্সিসাসে প্রজাপতি’, লিখেছেন মিরাজুল ইসলাম; এ কে শাহনেওয়াজের ‘৭ মার্চের ভাষণ: বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’; নাগিব মাহফুজের সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘লাভ ইন দ্য রেইনের অনুবাদ গ্রন্থ, অনুবাদ করেছেন মলয় পাঁড়ে। তাম্রলিপি এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন ‘নিয়ান’। শিশুদের জন্য জাফর ইকবালের আরেকটি বই ‘তুনুর আজব কাহিনী’ বের হবে এখান থেকেই। এছাড়া গুলতেকিন খানের কবিতার বই ‘বালিঘড়ি উল্টে যেতে থাকে’ প্রকাশ করেছেন তারা। এদের পাশাপাশি ইউপিএল, আগামী, অন্যপ্রকাশ, সময়, প্রথমা, অ্যাডর্ন, মাওলা ব্রাদার্স, কথাপ্রকাশসহ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকেও ভালো বই প্রকাশ পেতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।