বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে পানি নিয়ে দ্বিমুখী সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু এলাকায় ফসলি জমিতে পানির জন্য হাহাকার দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে কিছু হাওরে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। পানির জন্য সিলেট অঞ্চলের বোরো চাষিরা পড়েছেন সংকটে। এরই মধ্যে কোনো কোনো স্থানে মত্স্য শিকারিরা নীতিমালা ভেঙে জলমহালের পানি সেচে মাছ ধরছে।
জানা গেছে, ছাতক উপজেলার পাগনারপাড় জলমহাল শুকিয়ে মাছ শিকার চলছে। এতে ওই হাওরের একশত বিঘা জমিতে রোপণ করা ধান গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। আরো একশ বিঘা জমিতে চাষ দেয়া যাচ্ছে না পানির অভাবে। পাগনারপাড় গ্রামের মনির উদ্দিনসহ ৩৬ জন কৃষক জানান, সোনারতরী মত্স্য সমবায় সমিতির নামে লিজ নেয়া পাগনারপাড় জলমহাল পামপ দিয়ে পানি শুকিয়ে মত্স্য শিকার চলায় সেখানে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, ভরা বোরো মৌসুমে বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত দিরাইর রারল গ্রামের এক কৃষক জানান, বিশাল চেপ্টি, নলুয়া, টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থা করুণ। হাওরেতে বটে, নদীতেও পানি নেই। অনেকে কৃষক জমিতে হাল দিয়ে বিপদে পড়েছেন। তারা এখন বৃষ্টির অপেক্ষায়। তিনি আরো বলেন, কুমার খালি নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষ সেচ দিতে পারছে না। এখন এই নদী দিয়ে নৌকাও চলে না।
তিনি বলেন, দিরাই-সরমঙ্গল, জগদল, করিমপুর, তাড়ল, কুলঞ্জ, জগন্নাথপুরের কুলঞ্জ ইউপির হাজার হাজার কৃষক পানির জন্য হাহাকার করছে। এলাকার কৃষকরা বৃষ্টির জন্য দোয়া করছেন। নতুবা তাদের জমি বিরান হয়ে পড়বে।
সূত্রমতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নলজুর নদীর ১০ কিলোমিটার এলাকা খননের কথা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে পারেনি বলে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। পাউবো’র এক কর্মকর্তা জানান, নদীটি খননের জন্য আবারো টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের কানাইখালী নদীতে খনন কাজ সময়মতো শুরু না হওয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসন হয়নি বিশাল পাগনার হাওরের বোরো জমির। জেলায় বোরো চাষাবাদ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু বৃহত্তর পাগনার হাওরের মধ্যবর্তী বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের জমি এখনো পানির নিচেই। তাই এলাকায় ৬টি মেশিন দিয়ে পানি সেচে ধান রোপণের উদ্যোগ নিয়েছেন কয়েক গ্রামের কৃষকেরা। চারটি ডিজেলচালিত পাওয়ার পাম্প দিয়ে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের গঙ্গাধরপুর গ্রামের সামনের হাওরের পানি নিষ্কাশন চলছে। হাওরে প্রায় শতাধিক একর জমির পানি কৃষকেরা নিজ উদ্যোগে প্রতি কেদার (৩০ শতক) নিষ্কাশনের জন্য ২০০ টাকা করে প্রদান করেছেন। হাওরের পানি নিষ্কাশন করতে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকা ডিজেল লাগে। তারপরও চাষবাসের পর ধান গোলায় তোলা যাবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ ধান পাকার সময় অতিবৃষ্টি নামলে আরেক বিপদ।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র পওর-১ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, পাগনার হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে গজারিয়া খাল খননের কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। কানাইখালী খনন কাজও চলমান। দুইটি প্রকল্পের প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ২৫ জুন পর্যন্ত। এর আগেই দুইটি প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে বলে তিনি জানান।
সূত্র জানায়, পলি মাটিতে ভরাটকৃত কানাইখালী নদীর ৪ দশমিক ২৫ কিলোমিটার খননে ৮৭ লাখ টাকা ও হাওরের পানি প্রবাহের জন্য গজারিয়ার ভরাটকৃত খালের ৩ দশমিক ৮০ কিলোমিটার খনন করতে ২ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে পাগনার হাওরের মধ্যবর্তী এলাকায় জলাবদ্ধতায় রয়েছে অন্তত দেড় হাজার একর বোরো জমি।
জামালগঞ্জ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি অফিসার কে এম বদরুল হক জানিয়েছেন, গত বছরের চেয়ে এবার জলাবদ্ধতার পরিমাণ কিছুটা কম। তিনি জানান হাজার-দেড় হাজার একর জমিতে পানি রয়েছে। তবে পানি এখনো নিষ্কাশিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও কৃষকরাও পানি নিষ্কাশন করছেন।
ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শান্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা ইয়াসিন চৌধুরী বলেন, অনেক জমি এখনো পানির নিচে আছে। গঙ্গাধরপুর গ্রামের গৃহস্থ জগদীশ তালুকদার বলেন, কানাই নদী ভরাট হওয়ায় ২০-২৫ বছর ধরে জলাবদ্ধতা চলছে। আমরা বাধ্য হয়ে পামপ দিয়ে পানি সেচে ধান রোপণ করি।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ বলেন, ভরাটকৃত কানাইখালীতে বারবার খনন প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও কৃষকের দুর্ভোগ লাগব হচ্ছে না। জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শামীম আল ইমরান বলেন, কানাইখালী ও গজারিয়া খাল ভরাটের ফলে পাগনার হাওরে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, এবার সুনামগঞ্জ জেলায় ২ লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্পাদিত বোরো ধান অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষায় ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে হাওর রক্ষাবাঁধ নির্মাণে কাজ করছে পাউবো। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে।