গত ১২ এপ্রিল মালিবাগ হোসাফ টাওয়ারে একটি বেসরকারি ব্যাংকে গিয়েছিলাম টাকা উত্তোলন করার জন্য। যেহেতু দুই দিন পর কঠোর এবং সর্বাত্মক লকডাউন দেওয়া হয়েছে দেশব্যাপী। তাই ব্যাংকে গ্রাহকদের প্রচণ্ড ভিড় ছিল। আমি একটি লাইনে দাঁড়ালাম। যদিও ব্যাংকের ম্যানেজার আমার পূর্বপরিচিত, তাই আমি তার কাছে গেলে তিনি টাকা তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন; কিন্তু আমি ম্যানেজারের কাছে না গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এমন সময় এক বয়স্ক ব্যক্তি এলেন। তিনি ব্যাংকে প্রবেশ করেই মোবাইলে কথা বলতে বলতে এদিক ওদিক ঘুরতে লাগলেন। তার মুখে মাস্ক পরা থাকলেও তা ছিল থুতনির নিচে। নাক এবং মুখ খোলা ছিল। একসময় তিনি এসে আমার পিছনে লাইনে দাঁড়ালেন। আমি তাকে মাস্ক ভালোভাবে পরার জন্য অনুরোধ করলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমি মাস্ক কীভাবে পরব তা কি আপনার কাছ থেকে শিখতে হবে? আমি অত্যন্ত শান্তভাবে তাকে বললাম, আপনি যেভাবে মাস্ক পরেছেন তাতে আপনিও করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। অন্যেরাও আপনার দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। তিনি তখন বললেন, আল্লাহর হুকুম ছাড়া করোনা কাউকে আক্রমণ করে না। আমি করোনা দ্বারা কখনোই আক্রান্ত হব না। আর করোনা কখনো নাখ-মুখ থেকে ছড়ায় না। আমি তাকে বললাম, আপনি যদি নিশ্চিত হয়ে থাকেন করোনা আপনাকে সংক্রমিত করবে না, তাহলে মাস্ক পরেছেন কেন? আর পরেছেন যখন সঠিক নিয়মে মাস্ক পরেন। লাইনে দাঁড়ানো কয়েক ব্যক্তি ভদ্রলোককে ধমক দেন। তাকে সঠিকভাবে মাস্ক পরার জন্য পরামর্শ দেন। এরপর তিনি লাইনে না দাঁড়িয়ে দূরে একটি চেয়ারে গিয়ে বসলেন; কিন্তু মাস্ক তার থুতনির নিচেই রইল। তার এ ধরনের আচরণ আমাকে অত্যন্ত কষ্ট দিয়েছে। একজন বয়স্ক মানুষ এমন অশোভন আচরণ করতে পারেন তা আমি ভাবতেও পারিনি। অবশ্য শুধু এই ব্যক্তিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। রাস্তাঘাটে এমন শত শত মানুষ পাওয়া যাবে যারা অন্যায় করেও কারো সদুপদেশ শুনতে রাজি নন। এক শ্রেণির মানুষ মাস্ক পরিধান করাকে ফ্যাশনে পরিণত করেছেন। তারা মাস্ক পরেন কিন্তু নাক-মুখ খোলা রাখেন। ফলে মাস্ক পরিধানের উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। সরকার ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর এবং সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করেছেন; কিন্তু এই লকডাউন কোনো কাজে আসবে না, যদি সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা না যায়।
শুধু এই করোনাকালীন অবস্থাতেই যে সামাজিক রীতিনীতি উপেক্ষিত হচ্ছে তা নয়, স্বাভাবিক সময়েও আমরা সদাচার করা থেকে বিরত থাকছি। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশের মানুষ তো উগ্র হবার কথা নয়; কিন্তু ইদানীং আমরা অনেকের মধ্যেই উগ্রতা লক্ষ্য করছি। কথায় কথায় একজনের ওপর হামলা করা, কারো জীবন ছিনিয়ে নেওয়া স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উগ্রতা আজ সমাজের সর্বস্তরে বিরাজ করছে। সমাজের সর্বস্তরে উগ্রতার এই ব্যাপক বিস্তারের পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করছে তা হলো, সমাজে জ্ঞান চর্চা কমে গেছে। এখন জ্ঞান নয় অর্থ দিয়েই সবকিছু বিচার করা হয়। কথায় বলে, ‘ফলবান বৃক্ষ এবং জ্ঞানবান মানুষ আপনা থেকেই নত হয়।’ যুক্তি শেষ হলেই মানুষ লাঠি হাতে নেয়। সমাজের বৃহত্ শ্রেণির মধ্যে জ্ঞানার্জনের স্পৃহা ও প্রচেষ্টা লোপ পেয়েছে। ফলে সমাজে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘কিশোর গ্যাং’ নামে এক শ্রেণির অল্প বয়সি মাস্তানের উত্থান ঘটছে সমাজে। যারা এসব অপরাধী কিশোরের বাবা-মা তারা কেমন অভিভাবক তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আগেকার দিনে মানুষ একজনের বিপদে আর একজন এগিয়ে আসত। এখন কেউ বিপদে পড়লে অন্য কেউ সাধারণত এগিয়ে আসতে চায় না। মাঝেমধ্যেই শোনা যায়, গণপিটুনিতে মানুষ মারা যায়। এটা কী করে সম্ভব? একজন জ্যান্ত মানুষকে অনেক মানুষ মিলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করছে, অন্যরা তা দেখে উপভোগ করছে—এটা কি কল্পনা করা যায়?
ঘুষ-দুর্নীতিতে পুরো সমাজ কলুষিত হয়ে পড়েছে। আগেকার দিনে কিছু কিছু পেশায় ঘুষের প্রাধান্য ছিল। এসব পেশায় যারা নিয়োজিত থাকতেন তারা সব সময় সমাজে মাথা নিচু করে চলতেন। সম্ভ্রান্ত কোনো পরিবার সাধারণত এসব পেশাজীবীর সঙ্গে আত্মীয়তা করতে চাইতেন না। এখন আত্মীয়তা করার সময় বংশমর্যাদার চেয়ে ছেলের ‘উপরি আয়’ কেমন সেটাই বেশি গুরুত্ব পায়। এমনকি একসময় বাড়িতে চাকর হিসেবে ছিল এমন লোকও যদি বিদেশে গিয়ে বা অন্য কোনোভাবে প্রচুর বিত্তের মালিক হন, তাহলে তার কাছে মেয়ে বিয়ে দিতেও অনেকেই কার্পণ্য করেন না। আমাদের দেশের সামাজিক মর্যাদাবোধ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তাই সবকিছুই অর্থের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। বাংলাদেশের যে আর্থসামাজিক অবস্থা তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে করো কোটিপতি হবার কথা নয়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন অনেক চাকরিজীবীর সন্ধান পাওয়া যাবে, যারা কোটি কোটি টাকার মালিক। সমাজে নৈতিকতার প্রচণ্ড অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা দূর করার কোনো ব্যবস্থা কি নেওয়া যায় না?
n লেখক :অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক