আগামী ১ জুলাই ২০২১ থেকে ইতালিতে প্রতি শিশুর জন্য ৬৩ হাজার ৭৫০ ইউরো—এমনটাই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই গত ৩০ মার্চ ২০২১ তারিখটি ছিল ইতালির ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। এ কথাটিই টুইটারবার্তায় এবং সাংবাদিকদের সামনে হাসিমুখে উচ্চারণ করেন ৪৭ বছর বয়স্ক ইতালির সবার জন্য সমান সুযোগ এবং পরিবারবিষয়ক মন্ত্রী ড. এলেনা বোনেটি। এই দিনেই জন্মহার বৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইতালির সিনেটররা একটি আইন অনুমোদন করেন। এই আইনের আওতায় আগামী ১ জুলাই থেকে সেদেশের নারীরা গর্ভধারণের সপ্তম মাস থেকে সন্তানের ২১তম জন্মবার্ষিক পর্যন্ত সন্তানের জন্য মাসিক ২৫০ ইউরো অর্থাত্ বাংলাদেশের টাকায় মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। অন্যভাবে বলা চলে, মায়ের পেটে থাকাকালে তিন মাস এবং পরবর্তী ২১ বছরে প্রতিটি সন্তানের জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে আসবে ৬৩ হাজার ৭৫০ ইউরো। এই উদ্যোগের জন্য ইতালিয়ান সরকার ইতিমধ্যে বাজেট থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি ইউরো বরাদ্দ করেছে। বেশি বেশি সন্তানধারণে ভবিষ্যত্ পিতা-মাতাকে উত্সাহিত করার জন্যই এমন অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আইনটি অনুমোদনের পক্ষে ভোট দেন ২২৭ জন সিনেটর, বিপক্ষে ভোট পড়ে চারটি আর মাত্র দুজন সিনেটর ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
ইতালির জনপ্রতিনিধিরা এই আইনটি প্রণয়ন করতে যে হিসাবটি সামনে এনেছেন তা হলো, গত বছর ২০২০-এ সেদেশে মোট মৃত্যু হয়েছে ৭ লাখ ৪৬ হাজার মানুষের। অথচ একই সময়ে সে দেশে জন্ম নিয়েছে ৪ লাখ ৪ হাজার মানবশিশু। বিশাল এক ঘাটতি। দিন দিন এমন জন্ম-মৃত্যুর ফারাক আরো বেশি হতে পারে, অবস্থাদৃষ্টে তা-ই মনে হচ্ছে। ইতালির শিশুপার্কগুলোতে শিশুদের ভিড় দিনদিন কমতির দিকে। কিন্ডারগার্টেন সব প্রায় খালি হতে চলেছে। সবুজ গাছগাছালি ঘেরা উদ্যানগুলোতে শিশু-কিশোরদের আকর্ষণ করার জন্য নগর কর্তৃপক্ষ নানা রকম খেলাধুলার সরঞ্জাম সাজিয়ে রেখেছেন। সেসব অত্যাধুনিক সরঞ্জাম উপভোগ করার জন্য শিশু নেই, যেন শিশুবিহীন বিরান প্রান্তর! সন্তান নিতে ইতালির দম্পতিরা দিন দিনই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। একটি রাষ্ট্র শিশুহীন হয়ে যাচ্ছে। এমন হলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকট দেখা দেবে এবং ধীরে ধীরে পুরো জাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক জীবনে জৌলুস বৃদ্ধি পেলেও দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি ব্যয়ের চাপে স্বাচ্ছন্দ্য অনেকটাই কমে গেছে। তবে তারা উপসংহারে এ কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি যে, এমন নিম্ন-জন্মহার শুধু এক ইতালির সমস্যা তা নয়, উন্নত দেশগুলোর চিত্র প্রায় একই। ইউরোপসহ বেশ কিছু উন্নত দেশে উর্বরতার হার ২-এর নিচে চলে যাওয়াতেই বিপত্তি বেধেছে। অর্থাত্ সেসব দেশে নারীরা মাথাপিছু গড়ে দুই সন্তানেরও কম সন্তানের মা হচ্ছেন।
বাংলাদেশে এই উর্বরতার হার হচ্ছে ২-এর একটু বেশি। ফলে জনসংখ্যা অনেকটাই স্থিতিশীল থাকছে। তবে জাতিসংঘ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে জনসংখ্যার ঘনত্বে ভ্যাটিকান সিটির মতো অতি ক্ষুদ্র দেশকে বাদ দিলে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এক নম্বরে। বাংলাদেশে প্রতি বর্গমাইলে বাস করে গড়ে ১ হাজার ২৬৫ জন।
বিশেষজ্ঞরা এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে অচিরেই জন্মহারের নিম্নগতির কারণে উন্নত দেশগুলোতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকটে ভুগবে। সেই সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার কারণে বয়স্ক জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে এবং এ কারণে স্বাস্থ্য ও চিকিত্সা খাতে ব্যয় বাড়বে। তবে আফ্রিকা এবং এশিয়ার কিছু উন্নয়নশীল দেশে উর্বরতার হার আজও ৬। অথচ সেসব দেশ অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে অনেকটাই পর্যুদস্ত।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পৃথিবী জুড়ে মানুষের সংখ্যা ছিল ১৬০ কোটি। আর তার ঠিক ১০০ বছর পরেই ২০০০ সালে ৬০০ কোটির ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২০-এ পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭৮০ কোটি। জনমিতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা জানিয়েছেন ২০৫০-এ মানুষের সংখ্যা হবে প্রায় ১ হাজার কোটি। ইতিমধ্যেই দেশে দেশে জীবনধারণের প্রধান উপাদান বিশুদ্ধ পানির অভাব প্রকট হতে শুরু করেছে। উন্নত প্রযুক্তির কারণে কৃষিক্ষেত্রে উত্পাদন বৃদ্ধি পেলেও ‘নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ’ পত্রিকা জানিয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকরা ২১ শতাংশ ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। মানুষের ব্যবহারের জন্য এক বছরে আমাদের এই পৃথিবী যেটুকু প্রাকৃতিক সম্পদ উত্পন্ন করে, গেল বছর আমরা তা ২৯ জুলাইয়ে শেষ করে ফেলেছি। ৩০ জুলাই থেকে আগামী বছরের বরাদ্দ থেকে খরচ করছি। আমরা আমাদের জন্য বছরের বরাদ্দ বছর ফুরাবার আগেই শেষ করে ফেলছি। এমনটিই জানিয়েছে গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্ক। সেই ১৯৭০ থেকেই এমন বাকির খাতা একটু একটু করে শুরু হয়েছে। এভাবে ধার করে চলতে থাকলে অচিরেই এই পৃথিবী এক বিরান প্রান্তরে পরিণত হবে। এরকম অসংখ্য আশঙ্কা, উদ্বেগ থেকেই বিজ্ঞানীরা এখন অক্লান্তভাবে বসবাসের যোগ্য আরেকটি পৃথিবীর খোঁজ করে চলেছেন।
পরিহাস এই যে, পৃথিবীর এক অংশে প্রাচুর্যের কমতি নেই। অথচ তা ভোগ করার জন্য সেখানে মানুষের অভাব। আবার আরেক অংশে বেঁচে থাকার জন্য সর্বনিম্ন যতটুকু প্রয়োজন সেটুকুও মানুষ পাচ্ছে না। তার পরও পৃথিবী ঘুরে চলছে, চলবে।
n লেখক : ফ্রান্সপ্রবাসী গবেষক